বিদায়ী ভাষণে যা বললেন আবেগাপ্লুত মেসি

lionel messi farewell speech argentina

মাইক্রোফোন হাতে নিয়েও যেন কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না লিওনেল মেসি। সামনে হাজারো দর্শক, চারদিকে আকাশি-সাদা পতাকার ঢেউ। যে জার্সিটিকে ঘিরে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বপ্ন, ব্যর্থতা, কান্না আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের উল্লাস—সেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। চোখে জল, গলায় আবেগ। শুরুতেই বললেন, “আজ কিছু বলা খুব কঠিন।” তারপরই মনে পড়ল সদ্যপ্রয়াত বাবার কথা—“প্রথমেই বাবার কথা মনে পড়ছে।”

৬ অক্টোবর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-০ গোলে। বিদায়ী রাতেও মেসি ছিলেন স্বভাবসুলভ উজ্জ্বল—একটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দুটি গোল করিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ২০৮ ম্যাচ ও ১২৬ গোল নিয়ে।

কিন্তু ম্যাচের ফল বা ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান ছাপিয়ে রাতটি হয়ে উঠেছিল একজন ফুটবলারের সঙ্গে একটি দেশের দীর্ঘ সম্পর্কের বিদায়পর্ব।

‘এই জার্সি পরা ছিল বিশাল গর্ব’

জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০ বছরেরও বেশি সময় খেলতে পারাকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

মেসি বলেন, “এই জার্সি পরা ছিল বিশাল গর্ব।” সেই গর্ব শুধু বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকা জয়ের সময়ের নয়; ব্যর্থতার বছরগুলোতেও দেশের হয়ে লড়াই করে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের প্রথম ভাগ ছিল হতাশায় ভরা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, একের পর এক কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতা—একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরও ঘোষণা করেছিলেন তিনি। পরে ফিরে এসে সেই গল্পটাই বদলে দেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফাইনালিসিমা ও কাতার বিশ্বকাপ এবং পরে আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা—জাতীয় দলের হয়ে অধরা প্রায় সব স্বপ্নই পূরণ করেন মেসি।

সেই দীর্ঘ যাত্রার দিকে ফিরে মেসির কণ্ঠে তাই ছিল তৃপ্তি ও কষ্ট—দুটিই।

‘আর না আসতে পারাটা খুব কষ্টের হবে’

বিদায়ের সবচেয়ে আবেগঘন অংশটি আসে যখন মেসি বলেন, সামনে আর জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেওয়া হবে না, সতীর্থদের সঙ্গে একইভাবে সময় কাটানো হবে না।

তিনি বলেন, “আর না আসতে পারাটা খুব কষ্টের হবে।” জাতীয় দলের হয়ে খেলাকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হিসেবেও বর্ণনা করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া ছিল তার জীবনের নিয়মিত অংশ। বার্সেলোনা, প্যারিস কিংবা মায়ামি—ক্লাব ফুটবলে ঠিকানা বদলেছে, কিন্তু আকাশি-সাদা জার্সির ডাক ছিল একই। সেই অভ্যাসই এবার স্থায়ীভাবে থামছে।

মেসি বলেন, মন চাইলে তিনি সারাজীবনই জাতীয় দলের সঙ্গে থাকতে চাইতেন। কিন্তু নিজের সময় যে শেষ হয়েছে, সেটিও মেনে নিয়েছেন।

বাবার কথা বলতে গিয়ে আরও আবেগাপ্লুত

মেসির বিদায়ী ভাষণের শুরুতেই উঠে আসে তার বাবা হোর্হে মেসির কথা। আগস্টে বাবাকে হারানোর পর এটিই ছিল মেসির সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। জাতীয় দলের শেষ ম্যাচের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমেই বাবাকে স্মরণ করেন।

মেসির ফুটবল জীবনে তার পরিবারের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। ছোটবেলায় রোসারিও থেকে বার্সেলোনায় চলে যাওয়া, ফুটবলার হিসেবে বেড়ে ওঠা এবং পরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার—সবকিছুর সঙ্গে পরিবার ছিল নিবিড়ভাবে জড়িত।

তাই বিদায়ের রাতে হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়েও মেসির প্রথম ভাবনা চলে যায় পরিবারের দিকেই। এমন এক মুহূর্তে সেই ব্যক্তির অনুপস্থিতি তার আবেগকে আরও ভারী করে তোলে।

২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়েও বললেন মেসি

নিজের শেষ বিশ্বকাপ নিয়েও কথা বলেছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আবারও শিরোপার খুব কাছে পৌঁছেছিল। ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় দলটি।

মেসি বলেন, “আমরা খুব কাছে গিয়েছিলাম।” বিশ্বকাপের পর বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, “কিছু অস্বাভাবিক ঘটেনি।”

তার ব্যাখ্যায়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে বড় চাপ ফেলেছিল। সেই কঠিন ম্যাচের কয়েক দিনের মধ্যেই ফাইনালে নামতে হয়েছিল দলকে। এরপরও সতীর্থদের প্রচেষ্টা নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে জানান মেসি।

ব্যর্থতার দায় কাউকে দিতে চাননি তিনি। বরং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময় যাদের সঙ্গে খেলেছেন, তাদের প্রত্যেকেই দেশের জার্সির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন—এমন বার্তাই দিয়েছেন।

সতীর্থদের দিলেন স্বপ্নপূরণের কৃতিত্ব

বিশ্বকাপজয়ী দলের সতীর্থদের কথাও আলাদাভাবে বলেছেন মেসি। ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে যে দলটির সঙ্গে তিনি সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো পেয়েছেন, তাদের প্রতিই ছিল বিশেষ কৃতজ্ঞতা।

মেসির বক্তব্যের সারকথা ছিল—স্বপ্নপূরণ শুধু তার একার অর্জন নয়। সতীর্থদের কারণেই বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো ট্রফি জয়ের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও যেন সেই সম্পর্কের প্রতীকী ছবি দেখা গেছে। প্রথম গোলটি আসে মেসির পাস থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির পায়ে। দীর্ঘ ১৭ বছর মেসির সঙ্গে জাতীয় দলে খেলা ওতামেন্দিও এই ম্যাচে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান। পরে মেসির আরেকটি পাস থেকে গোল করেন তরুণ নিকো পাজ। আর ম্যাচের শেষ গোলটি পেনাল্টি থেকে করেন মেসি নিজেই।

একদিকে দীর্ঘদিনের সতীর্থ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—দুজনের গোলেই সহায়তা করেন বিদায়ী অধিনায়ক।

নতুন প্রজন্মের জন্য বিশেষ বার্তা

বিদায়ী ভাষণ শুধু স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ রাখেননি মেসি। নিজের পরের আর্জেন্টিনা দল এবং সমর্থকদের প্রতিও বার্তা দিয়েছেন তিনি।

তার মতে, জাতীয় দল সবসময় সাফল্য পাবে—এমনটা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। কঠিন সময় আবারও আসতে পারে। তখন দল এবং সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে।

মেসি বলেন, “আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।” বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই এই কথা বলেছেন মেসি। কারণ এমন সময়ও গেছে যখন আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা না জেতায় তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সমালোচিত খেলোয়াড়দের একজন। আবার সেই একই দেশের মানুষই পরে তাকে বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিতে দেখেছে।

যে মনুমেন্টালে আনন্দ, সেখানেই সবচেয়ে কষ্টের দিন

বিদায়ী ভাষণে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের সঙ্গে নিজের স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন মেসি।

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা যখন প্রথমবার দেশে ফিরে এই মাঠে খেলেছিল, সেই দিনটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্বকাপ হাতে সমর্থকদের সামনে দাঁড়ানোর সেই স্মৃতি ছিল তার কাছে বিশেষ।

কিন্তু এবার একই মাঠে দাঁড়িয়ে অনুভূতিটা একেবারেই বিপরীত। মেসির ভাষায়, জাতীয় দলের রং আর মাঠে নেমে প্রতিনিধিত্ব করতে না পারার কারণে এটিই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনগুলোর একটি।

এখন থেকে তিনি আর মাঠের ভেতরে থাকবেন না। গ্যালারির অন্য প্রান্তে থাকা একজন আর্জেন্টিনা সমর্থকের মতোই দলকে সমর্থন করবেন বলে জানান।

‘আমি এখান থেকে যেতে চাই না’

দীর্ঘ প্রায় নয় মিনিটের বক্তব্যের শেষদিকে মেসি নিজেই মজা করে বলেন, সাধারণ সময়ের তুলনায় তিনি অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু তখনও যেন মাইক্রোফোন রাখতে চাইছিলেন না।

তারপর আসে বিদায়ের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বাক্যগুলোর একটি—“আমি এখান থেকে যেতে চাই না।” কিছুক্ষণ পর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “আমি তোমাদের ভালোবাসি, খুব মিস করব।”

গ্যালারি থেকে তখন আবারও ভেসে আসে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি।

জাতীয় সঙ্গীতের সময়ই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি। ম্যাচ শেষে সতীর্থ, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও রেফারিরা তাকে ঘিরে ধরেন। এরপর ড্রোন শো, আলো, আতশবাজি আর সংগীতের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানানো হয়। বুয়েনস আয়ার্সের বিভিন্ন স্থাপনাও আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে আলোকিত করা হয়েছিল।

শেষে মেসির কণ্ঠে ছিল সেই পরিচয়, যা দুই দশকের বেশি সময় তার ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগগুলোর একটি হয়ে থেকেছে—আর্জেন্টিনা।

তিনি জানিয়ে গেলেন, মাঠে আর জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সি পরে না নামলেও আর্জেন্টিনার একজন সমর্থক হিসেবেই থাকবেন। কারণ খেলোয়াড় হিসেবে অধ্যায়টি শেষ হলেও দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না।

২০০৫ সালে যে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের হতাশা দিয়ে, সেটিই ২১ বছর পর শেষ হলো বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে। শেষ রাতে তাই আর্জেন্টিনা শুধু একজন খেলোয়াড়কে বিদায় জানায়নি; বিদায় জানিয়েছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের একটি দীর্ঘ যুগকে।