স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটায় ব্যাপক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। একই সঙ্গে সংকটকে কেন্দ্র করে স্পেনের বিরুদ্ধে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সমালোচনাকে রাজনৈতিক ও অন্যায্য বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি মরক্কো থেকে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী সিউটায় প্রবেশ করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমান্তে বড় ধরনের অভিবাসন সংকট তৈরি হয়। ঘটনাটিকে ইইউর সীমান্তে আকস্মিকভাবে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অভিবাসী প্রবেশের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সানচেজ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের বর্তমান সভাপতিত্বকারী দেশের প্রধানমন্ত্রী মিখায়েল মার্টিনকে চিঠি দিয়ে দ্রুত ভিডিও কনফারেন্স আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিউটার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের মানবিক সহায়তা দেওয়া, তাদের ইউরোপের অন্য অংশে যাওয়া ঠেকানো এবং অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের প্রায় সবাইকে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছে স্পেন।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেসও বলেছেন, শেনজেন এলাকার অখণ্ডতা পুরোপুরি সুরক্ষিত রয়েছে। তার দাবি, সিউটায় প্রবেশকারীদের প্রায় সবাই ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফিরে গেছেন।
সিউটা শেনজেনের বাইরে
স্পেন সরকার জানিয়েছে, সিউটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ড হলেও এটি শেনজেনের অবাধ চলাচল এলাকার বাইরে। ফলে সিউটা থেকে মূল ভূখণ্ড স্পেনে আকাশ বা সমুদ্রপথে যেতে হলে পুলিশি পরিচয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সিউটায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করলেই কোনো ব্যক্তির স্পেনে থাকার অধিকার বা শেনজেন এলাকার অন্য দেশে অবাধে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় না।
নিয়মিতকরণ কর্মসূচি নিয়ে স্পেনের ব্যাখ্যা
সিউটায় সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলের সঙ্গে স্পেনের নতুন অভিবাসী নিয়মিতকরণ কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানিয়েছে সরকার।
স্পেনের সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিয়মিতকরণ কর্মসূচিতে আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগেই স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে এবং আবেদনের আগে অন্তত পাঁচ মাস ধারাবাহিকভাবে দেশটিতে অবস্থান করতে হবে।
শুক্রবার সিউটা সফরে গিয়ে সানচেজ ব্যাপক অভিবাসী প্রবেশকে স্পেনের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। মরক্কোর সহযোগিতায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও দ্রুত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শেনজেন থেকে স্পেনকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষোভ
ইইউর কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে স্পেনকে সাময়িকভাবে শেনজেন এলাকা থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বানে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সানচেজ।
ইইউ নেতাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব পক্ষপাত, ভুল তথ্য, অজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এমন অবস্থান ইউরোপীয় আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং ইইউ সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সংহতির নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ স্পেনের প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছে এবং সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কিছু দেশ স্পেনকে আক্রমণ করে শেনজেন থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে।
২২ দেশের জরুরি বৈঠকের দাবি
এর মধ্যেই ইইউর ২৭ সদস্য দেশের মধ্যে ২২টি দেশ পৃথকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি ভিডিও বৈঠকের দাবি জানিয়েছে।
ইতালি ও ডেনমার্কের উদ্যোগে পাঠানো যৌথ চিঠিতে বলা হয়েছে, সিউটার ঘটনা ইইউর বহিঃসীমান্ত সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে অনিয়মিত প্রবেশ ঠেকাতে দ্রুত সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
চিঠিতে ফ্রন্টেক্সের অতিরিক্ত সহায়তা নেওয়া এবং মরক্কোর সঙ্গে ইইউর সহযোগিতা পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
জার্মানি, হাঙ্গেরি, সুইডেন ও পোল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই উদ্যোগে স্বাক্ষর করেছে। তবে ফ্রান্স, পর্তুগাল, লুক্সেমবার্গ, স্পেন ও আয়ারল্যান্ড এতে যোগ দেয়নি।
ইতালি-স্পেন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
সিউটা সংকটকে কেন্দ্র করে ইতালি ও স্পেনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাও বেড়েছে। ইতালি এক মাসের জন্য স্পেনের সঙ্গে শেনজেনের অবাধ চলাচল ব্যবস্থা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি এটিকে নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও সিউটার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস ইতালির অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছ থেকে স্পেন সংহতি প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক বিভাজন নয়।
ফ্রান্স অবশ্য স্পেনকে শেনজেন এলাকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, স্পেনের শেনজেন ছাড়ার বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই নেই এবং দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তায় ভালো সহযোগিতা রয়েছে।
তবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে স্পেন সীমান্তে পুলিশি তল্লাশি জোরদার করার কথা জানিয়েছে ফ্রান্স।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার দাবি
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সিউটায় প্রবেশকারীদের বেশির ভাগই ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফিরে গেছেন এবং মূল ভূখণ্ড স্পেন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য কোনো অংশে কেউ পৌঁছায়নি।
তিনি স্পেন ও মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, এই ঘটনা ইউরোপের বহিঃসীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
সপ্তাহের শেষ দিকে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিউটার পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যারা এখনও সেখানে অবস্থান করছেন, তাদের বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হবে অথবা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
