স্পেন ও ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। আগুনের দ্রুত বিস্তারের কারণে দুই দেশ মিলিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, প্রবল বাতাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
স্পেনে মধ্যাঞ্চল থেকে প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে ১ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী শহর বোর্দো ও আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনে প্রথমবার জাতীয় জরুরি অবস্থা
দাবানলের ভয়াবহতার কারণে স্পেন সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বন আগুনকে কেন্দ্র করে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শুক্রবার স্পেনের তিনটি বড় দাবানলের মধ্যে দুটি একত্রিত হয়ে আরও বড় আকার ধারণ করে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শান্তিকালীন উদ্ধার অভিযান
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, দেশটির ইতিহাসে এটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় শান্তিকালীন গণউদ্ধার অভিযান।
দাবানল মোকাবিলায় Airbus A400M Atlas সামরিক পরিবহন বিমানসহ মোট ১৯টি উড়োজাহাজ আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি ১,৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সরকার ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে ১৫ লাখ ফেস মাস্ক বিতরণ করেছে। আগুনের বিস্তার ঠেকাতে দমকলকর্মীরা আগুন প্রতিরোধী রাসায়নিক ব্যবহার এবং মাটিতে দীর্ঘ পরিখা খননের কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত বোর্দো মহানগরীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শহরটির পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধকার হয়ে গেলে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়েই দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। উপকূলীয় কিছু এলাকায় আগুন এত দ্রুত পৌঁছে যায় যে, কয়েকজনকে নৌকায় করে উদ্ধার করতে হয়েছে।
গিরন্দ অঞ্চলের প্রিফেক্ট সোফি ব্রোকা বলেন, দাবানল এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, গিরন্দ অঞ্চলের দাবানল এতটাই শক্তিশালী যে এটি নিজেই স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ তৈরি করছে, যা আগুনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের দেশে যে দাবানল চলছে তা নজিরবিহীন। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার মানুষের জীবন রক্ষা করা।”
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া রাজধানী মাদ্রিদের বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, বাইরে গেলে ধোঁয়া বা ছাই থাকলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে।
শনিবার ভ্যালেন্সিয়ার মানিসেস এলাকায় পৃথক একটি দাবানলে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান বড় দাবানলগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বনভূমিকে অত্যন্ত শুষ্ক করে তুলেছে, ফলে সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, চলতি বছর দেশটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যা দেশের বার্ষিক গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
অন্যদিকে ফ্রান্সে দাবানলে ৯৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে দেশের ইতিহাসে বন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
