ব্রেক্সিটের ১০ বছর: যুক্তরাজ্য কি আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে পারে?

uk-rejoin-eu

ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পর যুক্তরাজ্যে আবারও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশটি কি ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে পারে? ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার EU ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, কয়েক দফা নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং কঠিন আলোচনার পর যুক্তরাজ্য ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে EU থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু এক দশক পর ব্রেক্সিট নিয়ে জনমত অনেকটাই বদলেছে। অর্থনৈতিক চাপ, বাণিজ্যে জটিলতা, শ্রমিক সংকট, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে EU সম্পর্ককে সামনে এনেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিক এখন EU-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চান। কেউ কেউ সরাসরি পুনরায় সদস্যপদের পক্ষেও মত দিচ্ছেন।

তবে প্রশ্ন হলো, জনসমর্থন বাড়লেই কি যুক্তরাজ্য সহজে EU-তে ফিরতে পারবে? উত্তরটি সরল নয়।

যুক্তরাজ্য চাইলে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের আবেদন করতে পারে। EU চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ইউরোপীয় দেশ সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারে, তবে সেই আবেদন গ্রহণ, মূল্যায়ন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল।

অর্থাৎ, যুক্তরাজ্যের ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিন্তু ২০১৬ সালের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হতে পারে। ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্য EU-র ভেতরে বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করত। এর মধ্যে ছিল ইউরো মুদ্রা গ্রহণ না করা এবং Schengen visa-free travel zone-এর বাইরে থাকা। ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য যদি আবার সদস্যপদ চায়, EU আগের মতো একই ছাড় দেবে কি না, তা বড় প্রশ্ন।

জনমত বদলাচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক

ব্রিটেনে EU-তে ফেরার পক্ষে জনসমর্থন বাড়লেও বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সরাসরি ‘rejoin’ নীতি নিতে সতর্ক। কারণ ব্রেক্সিট এখনো যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বিভাজনমূলক রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর একটি। সরাসরি EU-তে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিলে পুরোনো Leave বনাম Remain বিতর্ক আবার তীব্র হতে পারে।

বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে যুক্তরাজ্যের মূলধারার নেতৃত্ব EU-র সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাইলেও single market, customs union এবং freedom of movement-এ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক। এর কারণ হলো, এসব ক্ষেত্রে ফিরতে গেলে যুক্তরাজ্যকে EU-র বহু নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং অভিবাসন নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়। EU-র ২৭ সদস্য দেশকেও যুক্তরাজ্যের ফেরার বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সম্মত হতে হবে। ব্রেক্সিট আলোচনার সময় দীর্ঘ টানাপোড়েন, উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্ত ইস্যু, বাণিজ্য চুক্তি এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস EU-র অনেক দেশের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করেছে।

EU চাইবে, যুক্তরাজ্য যদি ফিরে আসে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সিদ্ধান্ত হোক। আবার কয়েক বছর পর যুক্তরাজ্য নীতিগতভাবে বদলে গেলে EU নতুন করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে চাইবে না।

অর্থনীতি ফেরার বিতর্ককে শক্তিশালী করছে

ব্রেক্সিটপন্থীরা এক সময় বলেছিলেন, EU ছাড়লে যুক্তরাজ্য নিজস্ব বাণিজ্য নীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যবসা এখন বেশি কাগজপত্র, সীমান্ত বিলম্ব, বাড়তি খরচ এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশে জটিলতার অভিযোগ করছে।

অটোমোবাইল, খাদ্য, কৃষি, hospitality এবং ছোট ব্যবসার ওপর ব্রেক্সিট-পরবর্তী নিয়মের প্রভাব বেশি পড়েছে। শ্রমিক সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। EU থেকে শ্রমিক আসা কমে যাওয়ার পর অনেক খাতে non-EU কর্মীর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা EU-তে ফেরার আলোচনা জোরালো করছে। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু EU-তে ফিরে গেলেই যুক্তরাজ্যের সব অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান হবে না। কর, উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, জ্বালানি খরচ এবং বিনিয়োগ নীতির মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে যুক্তরাজ্য কি আবার EU-তে ফিরবে?

স্বল্পমেয়াদে সম্ভাবনা কম। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এখনো সরাসরি EU-তে ফেরার মতো শক্তিশালী সরকারি অবস্থান নেই। বরং সম্ভাব্য পথ হতে পারে ধাপে ধাপে সম্পর্ক উন্নয়ন—খাদ্য ও কৃষিপণ্য বাণিজ্যে সহজতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, গবেষণা, যুব চলাচল, ভিসা সহজীকরণ এবং সীমান্ত প্রক্রিয়া কমানো।

মাঝারি মেয়াদে যুক্তরাজ্য হয়তো EU-র সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ economic partnership বা Swiss-style arrangement নিয়ে আলোচনা করতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থায়ও EU নিয়ম মানা, আর্থিক অবদান এবং সীমিত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন প্রশ্ন থাকবে।

দীর্ঘমেয়াদে যদি জনমত আরও স্পষ্টভাবে EU-তে ফেরার পক্ষে যায় এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলো নতুন গণভোট বা সদস্যপদ আবেদনকে সমর্থন করে, তাহলে যুক্তরাজ্যের পুনরায় EU সদস্যপদ আলোচনায় আসতে পারে।

তবে এখনকার বাস্তবতা হলো, যুক্তরাজ্য EU-তে ফিরতে পারে—কিন্তু তা দ্রুত, সহজ বা আগের শর্তে হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্রেক্সিটের ১০ বছর পর দেশটি এখনো নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের উত্তর খুঁজছে: পুরোপুরি বাইরে থাকবে, ধীরে ধীরে কাছাকাছি যাবে, নাকি একদিন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার পথে হাঁটবে।