ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভবন ধসে অন্তত ১৮৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। উদ্ধারকারীরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে।
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার কিছু পর প্রথমে ৭.২ মাত্রার এবং এরপর ৭.৫ মাত্রার আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হওয়া এই ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ ভবন ছেড়ে রাস্তায়, খোলা জায়গায় ও নিজ নিজ গাড়িতে আশ্রয় নেন।
কারাকাসের বাসিন্দা বিলি এবরিন জানান, মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ভবন প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম আজই মারা যাব। দেয়ালের কংক্রিট ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।” পরে তিনি শত শত মানুষের সঙ্গে ভবন থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর উত্তরের লা গুয়াইরা রাজ্য। সেখানে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিন-রাত অভিযান চালাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় সেবা পুনরুদ্ধার শুরু হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বেসরকারি খাতকে উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে ইকুয়েডর, ডোমিনিকান রিপাবলিক, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও আর্জেন্টিনা উদ্ধার সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা। জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা এই দুর্যোগ মোকাবিলা করব।”
ভূমিকম্পের পর নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও এক্সে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিখোঁজদের তথ্য নিবন্ধনের জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার অনেক পুরোনো ভবন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। যদিও ১৯৫০ সালের পর নির্মিত অধিকাংশ ভবন ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় তৈরি করা হয়েছিল, তবুও নরম মাটির ওপর নির্মিত কিছু এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হয়েছে।
প্রকৌশলী জেসুস ভাসকেজ বলেন, ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এভাবে ধসে পড়া স্বাভাবিক নয়। অনেক ভবন এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো খালি করতে হতে পারে।
এদিকে রাজধানী কারাকাসে স্কুল, মেট্রোরেল ও বিভিন্ন সরকারি সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক স্কুলকে অস্থায়ী ত্রাণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। হাজারো মানুষ এখনো জানেন না, তারা কবে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবেন।
ভেনেজুয়েলা দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প হলেও এত বড় প্রাণহানির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। ১৯৬৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ জন এবং ১৯৯৭ সালের ভূমিকম্পে প্রায় ৮০ জন নিহত হয়েছিলেন।
