ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে একই পণ্য ও সেবার দাম কতটা ভিন্ন হতে পারে, তা নতুন Eurostat তথ্য আবারও স্পষ্ট করেছে। একই ধরনের একটি বাজারের ঝুড়ি ইউরোপের কোথাও অনেক বেশি দামে কিনতে হয়, আবার কোথাও তার অর্ধেকেরও কম খরচ হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাম দেখলেই জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না; স্থানীয় আয়, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতাও একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
Eurostat-এর price level indices অনুযায়ী, EU গড়কে ১০০ ধরে প্রতিটি দেশে একই ধরনের ভোক্তা পণ্য ও সেবার খরচ তুলনা করা হয়। অর্থাৎ, EU-তে যে পণ্য ও সেবার ঝুড়ির গড় খরচ ১০০ ইউরো, সেটি অন্য দেশে কত খরচ হতে পারে—এই সূচক তার ধারণা দেয়।
এই হিসাব তৈরি করতে Eurostat দুই হাজারের বেশি পণ্য ও সেবার বার্ষিক জাতীয় গড় দাম ব্যবহার করে। এতে খাবার, পোশাক, ভাড়া, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রিপোর্টে Actual Individual Consumption বা AIC সূচক ব্যবহার করা হয়েছে, যা শুধু পরিবারের সরাসরি ব্যয় নয়, বরং সরকারিভাবে অর্থায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো সেবাকেও বিবেচনায় নেয়। তাই আন্তর্জাতিক তুলনার ক্ষেত্রে এটি বেশি বিস্তৃত ও কার্যকর সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তথ্য অনুযায়ী, EU-এর মধ্যে লুক্সেমবার্গ সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর একটি, আর রোমানিয়ায় দাম সবচেয়ে কম। লুক্সেমবার্গে ভোক্তা পণ্যের মূল্যস্তর রোমানিয়ার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
EU সদস্য রাষ্ট্রের বাইরে EFTA ও প্রার্থী দেশগুলো যোগ করলে ব্যবধান আরও বড় হয়। সেখানে আইসল্যান্ড ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ হিসেবে উঠে এসেছে, আর উত্তর মেসিডোনিয়া সবচেয়ে সস্তা। এই দুই দেশের মধ্যে মূল্যস্তরের ব্যবধান প্রায় ৩.৭ গুণ।
আইসল্যান্ডে দাম EU গড়ের তুলনায় ৮৩.৭ শতাংশ বেশি। সুইজারল্যান্ডেও দাম EU গড়ের চেয়ে ৮১ শতাংশ বেশি। ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়েও ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। ডেনমার্কে দাম EU গড়ের তুলনায় ৪০.২ শতাংশ, আয়ারল্যান্ডে ৩৯.৬ শতাংশ এবং নরওয়েতে ৩৮.৪ শতাংশ বেশি।
এর পরের অবস্থানে রয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। সুইডেনে দাম EU গড়ের চেয়ে ২৮.৪ শতাংশ বেশি এবং ফিনল্যান্ডে ২৬.১ শতাংশ বেশি। নেদারল্যান্ডসে ১০০ ইউরোর EU গড় বাজারের ঝুড়ি কিনতে খরচ হতে পারে ১২০.৪ ইউরো, অস্ট্রিয়ায় ১১৯ ইউরো এবং বেলজিয়ামে ১১৮.১ ইউরো।
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জার্মানি সবচেয়ে ব্যয়বহুল। জার্মানিতে দাম EU গড়ের চেয়ে ৯.১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে স্পেনে দাম EU গড়ের তুলনায় ৮.৯ শতাংশ কম। এর মানে, একই বাজারের ঝুড়ির জন্য জার্মানিতে স্পেনের তুলনায় প্রায় ১৮ ইউরো বেশি খরচ হতে পারে। ফ্রান্সের সূচক ১০৬.৪, যা EU গড়ের সামান্য ওপরে। ইতালির সূচক ৯৮, অর্থাৎ EU গড়ের কিছুটা নিচে।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে দাম অনেক কম। উত্তর মেসিডোনিয়ায় EU গড়ে ১০০ ইউরো দামের বাজারের ঝুড়ি কিনতে খরচ হতে পারে মাত্র ৪৯.৭ ইউরো। তুরস্কে একই ঝুড়ির খরচ ৫২.২ ইউরো, বসনিয়ায় ৫৫.৭ ইউরো, রোমানিয়ায় ৫৮.৯ ইউরো এবং বুলগেরিয়ায় ৬০ ইউরো।
মন্টেনেগ্রো, সার্বিয়া, আলবেনিয়া, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিও তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। এসব দেশে দাম EU গড়ের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ কম। ক্রোয়েশিয়া, স্লোভাকিয়া, লিথুয়ানিয়া, চেকিয়া, গ্রিস ও পর্তুগালেও দাম EU গড়ের নিচে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, বেশি দাম মানেই কোনো দেশ কম সাশ্রয়ী—এমন ধারণা সবসময় ঠিক নয়। কারণ স্থানীয় আয় ও মজুরি দামকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। University of Groningen-এর অধ্যাপক Robert Inklaar বলেছেন, জীবনযাত্রার মান বোঝার জন্য শুধু মূল্যস্তর নয়, বরং স্থানীয় মজুরি দিয়ে মানুষ কী কিনতে পারে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সুইজারল্যান্ড দামি হলেও সেখানে মজুরি বেশি হওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। একই মূল্যস্তর যদি কম আয়ের দেশে থাকে, তাহলে সেটি মানুষের ওপর অনেক বেশি চাপ তৈরি করবে।
দামের পার্থক্যের বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মজুরি, উৎপাদনশীলতা, ভাড়া, পরিবহন খরচ, স্থানীয় কর, VAT, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সরবরাহ করা সেবা—যেমন রেস্টুরেন্ট, হেয়ারকাট, ডেন্টাল সেবা, বাসাভাড়া বা শিশু পরিচর্যা—সরাসরি স্থানীয় শ্রমমূল্যের সঙ্গে যুক্ত।
এমনকি আমদানি করা পণ্যের দামেও স্থানীয় খরচ যুক্ত হয়। দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর মজুরি, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলো সাধারণত সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর মধ্যেও পড়ে। উচ্চ দাম অনেক সময় উচ্চ আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো দেশের জীবনযাত্রার খরচ বুঝতে হলে দাম, আয় ও ক্রয়ক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
