পর্তুগালের নির্মাণ খাতে চলমান প্রকল্পগুলো সচল রাখতে আরও অন্তত ৮০ হাজার কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু দেশটির অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ির কারণে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় নির্মাণশিল্প সংগঠন AICCOPN বলেছে, বর্তমানে যে প্রকল্পগুলো চলছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করতেই খাতটিতে আরও ৮০ হাজার শ্রমিক দরকার। বড় অবকাঠামো প্রকল্প শুরু হলে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
পর্তুগালের নির্মাণশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে খাতটির মোট কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশ বিদেশি। পর্তুগালের অনেক দক্ষ নির্মাণশ্রমিক বেশি বেতনের আশায় ইউরোপের অন্যান্য দেশে চলে যাওয়ায় বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন বেড়েছে।
বিদেশি কর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ কমানোর কথা বলে পর্তুগাল সরকার ২০২৪ সাল থেকে অভিবাসন নীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে। আগের নিয়মে অনেক বিদেশি নাগরিক কাজের ভিসা ছাড়া পর্তুগালে প্রবেশের পর চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিবন্ধনের ভিত্তিতে বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারতেন।
নতুন নীতিতে সেই সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়েছে। ব্যাংক অব পর্তুগালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে নিট অভিবাসনের মাসিক হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
পর্তুগাল সরকার বলছে, অভিবাসনকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার পাশাপাশি দেশে অবস্থানরত বিদেশিদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করাই নতুন নীতির উদ্দেশ্য।
তবে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রমবাজারের প্রয়োজন বিবেচনা না করে দ্রুত কড়াকড়ি আরোপ করায় কর্মীসংকট আরও তীব্র হয়েছে।
কর্মীসংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন পর্তুগাল গুরুতর আবাসনসংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, জাতীয়ভাবে প্রায় তিন লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে।
পর্তুগাল সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ আবাসন সমাধান বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। সরকারি আবাসন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৯২০ কোটি ইউরোর বেশি বলে জানিয়েছে সরকার।
কিন্তু প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া না গেলে নতুন বাড়ি, সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হতে পারে। কিছু প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে নির্মাণ খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পর্তুগালের নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। তারপরও শ্রমিকের চাহিদা পূরণ হয়নি।
দেশটির নির্মাণশ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান আলবানো রিবেইরোর হিসাবে, বড় প্রকল্পগুলোর কাজ পুরোদমে শুরু হলে কর্মীর ঘাটতি ১ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। শুধু লিসবনের নতুন বিমানবন্দর নির্মাণেই প্রায় ১০ হাজার কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে।
দ্রুত ভিসা ব্যবস্থায় সীমিত সাড়া
বিদেশ থেকে কর্মী আনার সুবিধার্থে পর্তুগাল সরকার ২০২৫ সালে দ্রুত কর্মভিসা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালু করে। তবে এই ব্যবস্থায় বিদেশি কর্মী আনার আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে চাকরির চুক্তি ও উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করতে হয়।
এ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার আওতায় নির্মাণ খাতের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার ভিসা দেওয়া হয়েছে। নির্মাণশিল্পের বিপুল চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, পর্তুগালে এমনিতেই বাসাভাড়া বেশি এবং আবাসনের সংকট রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশি কর্মীদের জন্য আগে থেকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন।
দেশটির অন্যতম বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান JPS-এর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কর্মীর ৯০ শতাংশই বিদেশি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জোয়াও সুজা বলেছেন, নির্মাণ খাতের জন্য বিদেশি শ্রমিক অপরিহার্য। তবে কর্মী আনার আগে আবাসন নিশ্চিত করার শর্ত নিয়োগপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
বিদেশি কর্মীদের অনিশ্চয়তা
অভিবাসন নীতির পরিবর্তনে নতুন কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি পর্তুগালে আগে থেকে কর্মরত অনেক বিদেশির বসবাসের অনুমতি নবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নতুন নিয়মে কিছু বিদেশি কর্মীকে বসবাসের অনুমতি নবায়নের জন্য চাকরির চুক্তির পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক বাড়িভাড়ার চুক্তি দেখাতে হচ্ছে। কিন্তু অনেক শ্রমিক অনানুষ্ঠানিকভাবে কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকায় প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারছেন না।
নির্মাণ খাতের প্রতিনিধিরা বিদেশি কর্মীদের আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পর্তুগিজ নাগরিকদের নির্মাণকাজে উৎসাহিত করতে প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং বেতন উন্নত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু স্থানীয় কর্মী দিয়ে বর্তমান ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। আবাসন ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে হলে পর্তুগালকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগের পথ আরও কার্যকর করতে হবে।
নির্মাণ খাতে শ্রমিকের চাহিদা থাকার অর্থ এই নয় যে বিদেশি নাগরিকেরা সরাসরি পর্তুগালে গিয়ে কাজ শুরু করতে পারবেন। বৈধ চাকরির চুক্তি, প্রয়োজনীয় ভিসা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য শর্ত পূরণ করেই কাজের জন্য দেশটিতে যেতে হবে।
