পর্তুগালে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গড়ে ২১ দিনে কাজের ভিসা, কোন খাতে সুযোগ বেশি

বিদেশ থেকে বৈধভাবে কর্মী নিয়োগে চালু করা বিশেষ প্রটোকলের আওতায় সম্পূর্ণ আবেদন পাওয়ার পর গড়ে ২১ দিনের মধ্যে কাজের ভিসা দিচ্ছে পর্তুগাল। নির্ধারিত সময় ছিল ৩০ দিন। তবে এখন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর্মী নেওয়া হয়েছে কৃষি, নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট খাতে।

ইউরোপীয় কমিশনের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রবিষয়ক অধিদপ্তর ১৬ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পর্তুগালের নিয়ন্ত্রিত শ্রম অভিবাসন প্রটোকলের শুরুর পর্যায়ে ১ হাজার ১৬৩টি আবেদন প্রক্রিয়া করা হয়। ওই আবেদনগুলোর ভিসা দিতে গড়ে ২১ দিন সময় লেগেছে।

তবে ১ হাজার ১৬৩টি আবেদনকে প্রটোকলের বর্তমান মোট আবেদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পর্তুগাল সরকারের পরবর্তী হিসাবে, ২৭ মে পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় ৮ হাজার ৪৩৫টি ভিসা আবেদন জমা পড়ে এবং ৪০টি কনস্যুলার দপ্তরের মাধ্যমে ৫ হাজার ৮৮৩টি ভিসা দেওয়া হয়।

কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মী

প্রটোকলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে পর্তুগালে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট খাতে কাজ করছেন।

বাণিজ্য, সেবা ও শিল্প খাতেও বিদেশি কর্মীর চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে কৃষি ও নির্মাণ এখনো এই প্রক্রিয়ার প্রধান দুটি খাত।

পর্তুগাল সরকারের মে মাসের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, তখন পর্যন্ত দেওয়া ভিসার মধ্যে প্রায় ৩ হাজারটি কৃষি খাতের চাকরির জন্য ছিল। নির্মাণ খাতের জন্য দেওয়া হয়েছিল ১ হাজার ১৭৯টি ভিসা।

পর্তুগালের কৃষি খাতে মৌসুমি ও নিয়মিত—দুই ধরনের কর্মীর প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে আবাসন, সড়ক, রেলপথ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে নির্মাণ খাতে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে।

কী এই বিশেষ প্রটোকল

পর্তুগালের Protocolo de Cooperação para a Migração Laboral Regulada বা নিয়ন্ত্রিত শ্রম অভিবাসন সহযোগিতা প্রটোকল ২০২৫ সালের এপ্রিলে চালু করা হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো পর্তুগালের শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় বিদেশি কর্মীদের তাঁদের নিজ দেশে থাকা অবস্থায় বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত পথে নিয়োগ দেওয়া। পর্তুগালের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভিসা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এটি এমন কোনো উন্মুক্ত ব্যবস্থা নয়, যেখানে একজন চাকরিপ্রত্যাশী সরাসরি আবেদন করে ২১ দিনের মধ্যে ভিসা পাবেন। সাধারণত প্রটোকলে যুক্ত যোগ্য কোম্পানি, ব্যবসায়িক সংগঠন বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

পর্তুগালের ইন্টিগ্রেশন, মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম এজেন্সি—AIMA-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা বড় কোম্পানি, নিয়োগকারী সমিতি ও ব্যবসায়িক কনফেডারেশন এই প্রটোকলে যুক্ত হতে পারে। আবেদনকারী কর্মীর জন্য একটি বাস্তব চাকরি এবং প্রয়োজনীয় নথি থাকতে হয়।

২১ দিন কখন থেকে গণনা করা হয়

গড়ে ২১ দিনের সময়সীমা চাকরির জন্য আবেদন করার দিন থেকে নয়। নিয়োগকারী পক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব নথিসহ সম্পূর্ণ ভিসা আবেদন সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার দপ্তরে পৌঁছানোর পর থেকে এই সময় গণনা করা হয়।

নথি অসম্পূর্ণ থাকলে, অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হলে কিংবা আবেদনকারীর বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে। তাই ‘২১ দিনে পর্তুগালের ভিসা নিশ্চিত’—এমন দাবি বিভ্রান্তিকর।

পর্তুগাল সরকার বলেছে, সম্পূর্ণ আবেদন পাওয়ার পর কূটনৈতিক দপ্তরগুলো গড়ে ২১ দিনের মধ্যে ভিসা ইস্যু করেছে। প্রটোকলে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।

নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে যেসব দায়িত্ব নিতে হয়

দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়ার বিনিময়ে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

তাদের নৈতিকভাবে কর্মী নিয়োগ, বৈধ চাকরির ব্যবস্থা এবং পর্তুগালে পৌঁছানোর পর কর্মীর গ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করতে হয়। এর মধ্যে আবাসন, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং পর্তুগিজ ভাষা শেখার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

সরকারের মতে, এই ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু দ্রুত কর্মী আনা নয়। বিদেশি কর্মীরা যেন বৈধভাবে কাজ করতে পারেন এবং পর্তুগালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সেটিও প্রটোকলের অংশ।

বাংলাদেশিদের জন্য কী অর্থ বহন করে

বাংলাদেশি চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য কৃষি, নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট, শিল্প ও সেবা খাতে সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু কোনো খাতে কর্মীর চাহিদা থাকলেই সরাসরি ভিসা পাওয়া যাবে না।

প্রথমে পর্তুগালের একটি বৈধ নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রকৃত চাকরির প্রস্তাব বা চুক্তি থাকতে হবে। এরপর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি প্রটোকলের আওতায় আবেদন করতে পারবে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

এই প্রটোকলের আওতায় বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা ভিসা কোটা বা স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘২১ দিনে নিশ্চিত পর্তুগাল ভিসা’ বা ‘কোনো সাক্ষাৎকার ছাড়াই ভিসা’ ধরনের প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

চাকরির চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানের নাম, কর্মস্থল, বেতন, কাজের সময়, আবাসনের শর্ত এবং চুক্তির মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। পর্তুগালের কনস্যুলার দপ্তরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো ভিসাকে অনুমোদিত বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

কাজের ভিসাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বৈধ পথ

পর্তুগাল আগে ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভিসা ছাড়া দেশে প্রবেশ করা কিছু বিদেশিকে পরে কাজের ভিত্তিতে বসবাসের অনুমতির আবেদন করার সুযোগ দিত। সরকার ২০২৪ সালে সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।

এর পর থেকে বিদেশে থাকা চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য পর্তুগালে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগেই যথাযথ কাজের ভিসা নেওয়ার গুরুত্ব বেড়েছে। নিয়ন্ত্রিত শ্রম অভিবাসন প্রটোকল সেই বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত করার একটি ব্যবস্থা।

পর্তুগাল সরকার জানিয়েছে, এই প্রটোকলে কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে আবেদনের সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছিল।

কৃষি ও নির্মাণ খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ হলেও ভবিষ্যতে বাণিজ্য, সেবা ও শিল্প খাতেও বিদেশি কর্মীর চাহিদা বাড়তে পারে। তবে চাকরিপ্রত্যাশীদের কেবল বৈধ নিয়োগকারী, অনুমোদিত প্রক্রিয়া এবং সরকারি ভিসা নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদন করতে হবে।