জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ইউনূস: ‘জুলাই শুধু মাস নয়, গণমানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক’

Professor Muhammad Yunus

ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “আমাদের স্মৃতিতে জুলাই দীর্ঘ, ৩৬ দিনের মাস।” তাঁর মতে, জুলাই শুধু একটি মাস নয়; এটি গণমানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, স্বাধীন চিন্তা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিবৃতিতে ড. ইউনূস জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো ও পঙ্গুত্ব বরণকারী ব্যক্তিদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানান তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই দেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘জুলাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন’

বিবৃতিতে ড. ইউনূস বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

তিনি বলেন, আন্দোলনে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পাবলিক, প্রাইভেট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের এই ঐক্যই আন্দোলনের অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকার প্রশংসা

গণঅভ্যুত্থানের সময় সত্য তুলে ধরতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস।

এ ছাড়া রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের কণ্ঠ, লেখনী ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রিকশাচালক, শ্রমজীবী, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকাও স্মরণ করেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা। বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিভিন্নভাবে আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছিলেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

নারীদের সাহসের কথা স্মরণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, আন্দোলনে নারীরা সাহস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের নারীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

একইভাবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও ভূমিকা ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজের জন্য সাহস, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের উদাহরণ হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘ঐক্যবদ্ধ হলে শক্তিশালী কাঠামোকেও পরিবর্তন সম্ভব’

ড. ইউনূস বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দেশের সর্বস্তরের মানুষ একটি ন্যায়সঙ্গত লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হলে শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য বলে মনে হওয়া কাঠামোকেও পরিবর্তন করা সম্ভব।

এই চেতনাকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

বিবৃতির শেষাংশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক সম্প্রীতির পথ আরও সুদৃঢ় করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রার সূচনা হয়েছে, তা এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষায় বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নই হবে জাতির বড় দায়িত্ব।