ইতালির স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধের উদ্যোগ

italy-school-burqa-niqab-ban

ইতালির স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। একই সঙ্গে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ এবং স্কুলে মানিয়ে নিতে গুরুতর সমস্যায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো শিগগিরই মন্ত্রিসভায় তোলা হবে বলে জানিয়েছেন মেলোনি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) নিজের দল ব্রাদার্স অব ইতালির যুব সংগঠন জোভেন্তু নাজিওনালের এক অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা জানান ইতালির প্রধানমন্ত্রী। তবে একটি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী থাকতে পারবেন, সেই সংখ্যা এখনো জানাননি তিনি।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির স্কুলে বর্তমানে ভর্তি শিক্ষার্থীদের প্রায় ১১.৬ শতাংশ ইতালীয় নাগরিক নন।

স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধের পরিকল্পনা

মেলোনি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করা হবে। বোরকা সাধারণত পুরো শরীর ও মুখ ঢেকে রাখে এবং চোখের সামনে জাল থাকে। নিকাব মুখ ঢেকে রাখলেও চোখ খোলা থাকে। তবে হিজাব মুখ ঢাকে না।

মেলোনি বলেন, স্কুলে শিক্ষার্থীদের মুখ খোলা রাখতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ঐতিহ্যের নামে একজন তরুণীকে মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে আপস করা হবে না।

তবে এটি এখনো কার্যকর আইন নয়। সরকারে অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যায় সীমা

মেলোনির পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা আইন করে নির্ধারণ করা।

ইতালিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে আগে থেকেই একটি প্রশাসনিক সীমা রয়েছে। ২০১০ সালের একটি নির্দেশনায় সাধারণভাবে প্রতি শ্রেণিতে অ-ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে স্থানীয় জনসংখ্যার ধরনসহ বিভিন্ন বাস্তব কারণে এটি সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হয়নি। নতুন প্রস্তাবে সেই ব্যবস্থাকে কীভাবে পরিবর্তন করা হবে এবং নতুন সর্বোচ্চ সীমা কত হবে, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

অভিভাবকদেরও ইতালীয় ভাষা শেখার শর্ত

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী ইতালির স্কুলব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে ‘গুরুতর সমস্যায়’ পড়বে, তাদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হবে।

মেলোনির যুক্তি, একটি শ্রেণিতে ইতালীয় ভাষা না জানা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে ভাষা শেখানো ও অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের একীভূত করার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

একই অনুষ্ঠানে মেলোনি বলেন, ইতালির কোনো শ্রেণিকক্ষে ইতালীয় শিশুরা সংখ্যালঘু হয়ে নিজেদের কোণঠাসা মনে করবে—এমন পরিস্থিতি তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।

নির্বাচন সামনে, অভিবাসন নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

ইতালিতে আগামী বছর সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে অভিবাসন ও সামাজিক একীভূতকরণের মতো বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

মেলোনির ব্রাদার্স অব ইতালির ডান দিকে রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রবার্তো ভান্নাচ্চি। তাঁর ফুতুরো নাজিওনালে দল অভিবাসন ও বোরকা-নিকাবের বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থানের কথা বলছে। জুলাইয়ে দলটি পূর্ণ মুখঢাকা পোশাকের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাবও তুলেছিল।

ইতালির কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় অবস্থানের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপমুখী অভিবাসনের অন্যতম প্রবেশপথ। ফলে অভিবাসন, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় প্রতীক ও বিদেশিদের সামাজিক একীভূতকরণ দেশটির রাজনীতিতে বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়েছে।

প্রস্তাবের সমালোচনাও হচ্ছে

সরকারি জোটের বিভিন্ন অংশ থেকে পরিকল্পনাটির প্রতি সমর্থন এলেও বিরোধী রাজনীতিক ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এর সমালোচনা করছেন।

সমালোচকদের একটি উদ্বেগ হলো, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কঠোরভাবে সীমিত করা হলে কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে নিজ এলাকার স্কুল ছেড়ে দূরের প্রতিষ্ঠানে যেতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইতালির সংবিধানে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিধানের সঙ্গে নতুন নিয়মের সামঞ্জস্য নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।

ফলে মেলোনির ঘোষণার পরও বোরকা-নিকাব নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি শিক্ষার্থীর সীমা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদিত হলে এর সুনির্দিষ্ট সীমা, প্রয়োগপদ্ধতি এবং ব্যতিক্রমগুলো আরও পরিষ্কার হবে।