পর্তুগালে জন্ম নেওয়া শিশুও হতে পারে ডিপোর্ট, নতুন আইন অনুমোদন রাষ্ট্রপতির

portugal-deportation-law

পর্তুগালে জন্ম নেওয়া বিদেশি শিশুকেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেশ থেকে বহিষ্কারের সুযোগ রেখে নতুন বিদেশি, আশ্রয় ও প্রত্যাবর্তন আইন অনুমোদন করেছেন দেশটির রাষ্ট্রপতি আন্তোনিও জোসে সেগুরো। নতুন আইনে বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানকেও তাঁদের সঙ্গে পর্তুগাল ছাড়তে হতে পারে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) আইনটিতে অনুমোদন দেন পর্তুগিজ রাষ্ট্রপতি। এর আগে শিশুদের অধিকার, বাবা-মা ও সন্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এবং বিদেশিদের দীর্ঘ সময় আটক রাখার মতো কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনটি সাংবিধানিক আদালতে পাঠিয়েছিলেন তিনি।

পর্তুগালের সাংবিধানিক আদালত গত ২৮ আগস্ট সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতির পর্যালোচনার জন্য পাঠানো ধারাগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। এরপর রাষ্ট্রপতি আইনটিতে অনুমোদন দেন।

পর্তুগালে জন্মালেও বহিষ্কারের সুযোগ

আইনটির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো শিশুদের বহিষ্কারের বিধান।

রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক আদালতের কাছে যে বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী বিদেশি শিশুকে জোরপূর্বক দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা বহিষ্কারের সুযোগ।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিধানে কিছু পরিস্থিতিতে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী বিদেশি শিশুর ‘coercive removal’ বা জোরপূর্বক অপসারণ এবং বহিষ্কারের সুযোগ রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া সব বিদেশি শিশুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিপোর্ট করা হবে। শিশুর নাগরিকত্ব, বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থা এবং প্রতিটি পরিবারের আইনি পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পর্তুগিজ নাগরিক সন্তান থাকলেও বাবা-মা বহিষ্কারের আওতায় আসতে পারেন

নতুন আইনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পর্তুগালে বসবাসরত কোনো বিদেশি ব্যক্তির দায়িত্বে পর্তুগিজ নাগরিক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওই বিদেশি ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা সম্ভব হতে পারে।

পর্তুগালের সাংবিধানিক আদালতের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সংশোধিত আইনের ১৩৫ অনুচ্ছেদের একটি বিধান এমন বিদেশি নাগরিকের জোরপূর্বক অপসারণ বা বহিষ্কারের সুযোগ দেয়, যাঁর দায়িত্বে পর্তুগালে বসবাসরত পর্তুগিজ নাগরিক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রয়েছে।

এই বিধান নিয়েই রাষ্ট্রপতি পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এবং পর্তুগিজ নাগরিক শিশুর ওপর এর পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

অর্থাৎ, বাবা-মাকে বহিষ্কার করা হলে সন্তান পর্তুগিজ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে তাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে অন্য দেশে যেতে হতে পারে অথবা পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কেন এই আইন

পর্তুগাল সরকার বলছে, নতুন প্রত্যাবর্তন আইনের লক্ষ্য হচ্ছে দেশে থাকার আইনি অধিকার নেই—এমন বিদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করা।

সরকারের দাবি, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগছিল। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইনে আশ্রয়প্রার্থী, অনিয়মিত অভিবাসী, বিদেশিদের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রাখা এবং দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায়ও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সর্বোচ্চ ১৮০ দিন আটক রাখার বিধান

আইনটি ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ হলো বিদেশি নাগরিকদের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রাখার সময়সীমা।

নতুন ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে একজন বিদেশিকে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত অস্থায়ী আটককেন্দ্রে রাখা সম্ভব হবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা আরও বাড়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। এই বিধানের আনুপাতিকতা নিয়েও রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক আদালতের মতামত চেয়েছিলেন।

বিদেশি কমিউনিটির মধ্যেও উদ্বেগ

আইনটি প্রথম সাংবিধানিক আদালতে পাঠানোর সময় পর্তুগালে বসবাসরত বিভিন্ন বিদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে শিশু ও পরিবারের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রপতির উদ্বেগকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন।

তবে সাংবিধানিক আদালতের সবুজ সংকেতের পর শেষ পর্যন্ত আইনটিতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ায় বিষয়টি আবারও অভিবাসী কমিউনিটিগুলোর আলোচনায় এসেছে।

নতুন আইন নিয়ে পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সন্তান পর্তুগালে জন্মগ্রহণ করেছে, কিন্তু বাবা-মা বা সন্তানের অভিবাসন ও নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের মধ্যে আইনটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রবাসীদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—শুধু পর্তুগালে জন্মগ্রহণ করলেই একটি শিশু কি বহিষ্কার থেকে সুরক্ষিত থাকবে, বাবা-মায়ের রেসিডেন্স জটিলতা সন্তানের ওপর কী প্রভাব ফেলবে এবং কোনো পরিবারকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলে সন্তানকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশ ছাড়তে হবে কি না।

পর্তুগাল প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক ও পর্তুগাল বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী নতুন এই আইনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি কালো আইন, যা মানবতার বিপক্ষে।”

নতুন প্রত্যাবর্তন আইনটিও বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যেসব পরিবারের অভিবাসন অবস্থান এখনো অনিয়মিত বা যাঁদের রেসিডেন্স ও নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রবাসীদের একটি বড় উদ্বেগ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাঁদের প্রশ্ন, একটি পরিবার বছরের পর বছর পর্তুগালে বসবাস করার পর সন্তান সেখানে জন্মগ্রহণ করলে বাবা-মায়ের অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে পুরো পরিবারকে দেশ ছাড়তে হলে শিশুটির শিক্ষা, সামাজিক জীবন ও ভবিষ্যৎ কীভাবে বিবেচনা করা হবে।

তবে নতুন আইন অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে পর্তুগালে বসবাসরত অনিয়মিত সব অভিবাসী বা তাঁদের সন্তানদের একসঙ্গে বহিষ্কার করা হবে। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি অবস্থা এবং শিশু ও পরিবারের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

সাংবিধানিক আদালত কী বলেছে

পর্তুগালের সাংবিধানিক আদালত রাষ্ট্রপতির উত্থাপিত ১১টি বিধান পর্যালোচনা করে সেগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। আদালতের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে, আদালতের সিদ্ধান্তে শিশুদের বহিষ্কার, বাবা-মা ও সন্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিদের বহিষ্কারের মতো বিষয়ে কিছু ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আদালত ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

এখন কী হবে

রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর আইনটি কার্যকর হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এর বাস্তব প্রয়োগ শুরু হবে। পর্তুগালে বসবাসরত বিদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিজেদের বর্তমান রেসিডেন্স ও অভিবাসন অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা। বিশেষ করে যেসব পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রয়েছে বা সন্তান পর্তুগালে জন্মগ্রহণ করেছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার—পর্তুগালে জন্মগ্রহণ করাই কোনো বিদেশি শিশুকে সব পরিস্থিতিতে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা দেবে, নতুন আইনের অধীনে এমন নিশ্চয়তা থাকছে না।