ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র বা ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপনের একটি অভিন্ন মডেলে সম্মত হয়েছে ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্রে প্রথম অনিয়মিত অভিবাসীদের স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিতে চায় দেশগুলো।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে পাঁচ দেশের মন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বৈঠকে ইইউর বাইরে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপন, পরিচালনা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তির একটি অভিন্ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলোতে মূলত এমন ব্যক্তিদের পাঠানো হবে, যাদের আশ্রয় আবেদন সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় দেশে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং যাদের নিজ দেশে সরাসরি ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
এর আগে তৃতীয় দেশে রিটার্ন সেন্টার গড়তে ইতালির মডেলে সমর্থন জানিয়েছিল চেকিয়া। এবার পাঁচটি ইউরোপীয় দেশ যৌথভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি সাধারণ মডেলে সম্মত হলো।
২০২৭ সালে অভিবাসী স্থানান্তরের লক্ষ্য
ডেনমার্কের অভিবাসন ও ইন্টিগ্রেশনমন্ত্রী মর্টেন বেডস্কভ বলেন, শুক্রবারের বৈঠকে গৃহীত নীতিমালা ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ইইউর বাইরে অংশীদার কোনো দেশে প্রথম অনিয়মিত অভিবাসীদের স্থানান্তরের জন্য প্রস্তুত হতে চায় পাঁচ দেশ।
তিনি বলেন, ইউরোপের অভিন্ন অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশগুলো।
তবে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন কেন্দ্রগুলো কোন দেশে স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উগান্ডা ও রুয়ান্ডার নাম সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পাঁচ দেশের কোনো সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
নতুন বছরের কাছাকাছি প্রথম চুক্তির আশা
ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস বর্তমানে এক বা একাধিক ইইউ-বহির্ভূত দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট জানান, চলতি বছরের মধ্যেই তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। নতুন বছরের কাছাকাছি সময়ে প্রথম চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য অংশীদার দেশের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জার্মানির মিউনিখে পাঁচ দেশের মন্ত্রীরা আবার বৈঠক করবেন।
গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রী থানস প্লেভরিস জানিয়েছেন, সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা আরও গভীর ও ফলপ্রসূ হচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রত্যাবাসন কেন্দ্র কারাগার নয়: ডেনমার্ক
ডেনমার্কের অভিবাসনমন্ত্রী দাবি করেছেন, প্রস্তাবিত রিটার্ন হাব কোনো কারাগার বা আটকশিবির হবে না। বরং এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে অংশীদার দেশগুলো অনিয়মিত অভিবাসীদের নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দেবে।
যদিও সমালোচকেরা বলছেন, আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করা হলে বাস্তবে এসব কেন্দ্র আটকশিবিরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পাঁচ দেশের তৈরি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ইইউর বাইরের দেশের সঙ্গে সমান এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
কেন্দ্রগুলোর ব্যয় বহন করবে পাঁচ দেশ
প্রত্যাবাসন কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার সম্পূর্ণ ব্যয় সংশ্লিষ্ট পাঁচ ইউরোপীয় দেশ বহন করতে পারে। পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোকে অতিরিক্ত অর্থসহায়তা, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব অথবা অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
প্রতিটি চুক্তিতে কেন্দ্রে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম, থাকার পরিবেশ, আইনি সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় দেশগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।
অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার বলেন, তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হচ্ছে অনিয়মিত অভিবাসনের সংখ্যা শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা।
এর আগে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও অবৈধ অভিবাসীদের ফেরানোর বিষয়ে একমত হয়েছিল ইইউ। নতুন প্রত্যাবাসন কেন্দ্রের পরিকল্পনাকে সেই কঠোর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী বলছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন
২০২৬ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত একটি নতুন আইনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিধি সদস্যদেশগুলোকে ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে রিটার্ন হাব স্থাপনের সুযোগ দেবে।
এসব কেন্দ্র চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে অথবা অভিবাসীদের নিজ দেশ কিংবা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে পাঠানোর আগে অস্থায়ী স্থানান্তর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে কেবল এমন তৃতীয় দেশের সঙ্গেই চুক্তি করা যাবে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং কাউকে নিপীড়নের ঝুঁকি রয়েছে—এমন দেশে না পাঠানোর ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি মেনে চলা হয়।
অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের এ ধরনের চুক্তির আওতার বাইরে রাখার কথাও নতুন বিধিতে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা
পাঁচ দেশের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা UNHCR এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে UNHCR-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংস্থাটিকে এখনো প্রস্তাবটির বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য তাদের কাছে নেই।
পাঁচ দেশ বলছে, পুরো প্রকল্প ইইউ আইন, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা
ইউরোপীয় নাগরিক সমাজ, শরণার্থী অধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন এনজিও ইইউর বাইরে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে।
তাদের আশঙ্কা, ইউরোপের বাইরে পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো তৃতীয় কোনো দেশের ভূখণ্ডে অভিবাসীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, সেটি যথাযথভাবে তদারক করতে পারবে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অনথিভুক্ত অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্রাসেলসভিত্তিক সংস্থা PICUM-এর পরিচালক মিশেল লেভয় বলেন, ইইউর বাইরে প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে পাঠানো হলে শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিবারগুলোকে ইউরোপে গড়ে তোলা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। অপরিচিত স্থানে তাদের দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের মহাসচিব শার্লট স্লেন্টের মতে, রিটার্ন হাব কেবল সীমিতসংখ্যক মানুষকে প্রত্যাবাসনের সুযোগ তৈরি করবে। এ ব্যবস্থা মানুষকে আরও বিপজ্জনক পথে ইউরোপে আসা থেকে বিরত রাখতে পারবে না এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হতে পারে।
আগের উদ্যোগে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি
ইউরোপের বাইরে আশ্রয়প্রার্থী ও অনিয়মিত অভিবাসীদের স্থানান্তরের আগের উদ্যোগগুলো খুব বেশি সফল হয়নি।
যুক্তরাজ্য আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠিয়ে সেখানে তাদের আবেদন যাচাইয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পরে দেশটি সেই প্রকল্প বাতিল করে। ডেনমার্কও ২০২৩ সালে একই ধরনের একটি জাতীয় পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ইউরোপীয় পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগের দিকে মনোযোগ দেয়।
অন্যদিকে ইতালি আলবেনিয়ায় স্থাপিত কেন্দ্রে প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার অভিবাসী রাখার পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৫ সালের মার্চে কেন্দ্রগুলোকে প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে রূপান্তরের পর সেখানে পাঠানো মানুষের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল।
আলবেনিয়ার কেন্দ্রগুলো পরিচালনায় ইতালির ৬৭০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি ব্যয় হতে পারে। ইতালির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, নিজ ভূখণ্ডে রাখার তুলনায় আলবেনিয়ার কেন্দ্রে অভিবাসীদের রাখার ব্যয় বেশি হচ্ছে।
পরিকল্পনায় আগ্রহী ইইউর আরও দেশ
ইউরোপের অন্তত ১৯টি দেশের সরকার রিটার্ন হাবকে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার একটি ‘উদ্ভাবনী সমাধান’ হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশগুলোর পক্ষ থেকে পাঠানো অভিবাসনবিষয়ক যৌথ চিঠিতে ইইউর বাইরে বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে মত দেওয়া হয়।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধতা, আশ্রয় আবেদন ও প্রত্যাবাসন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি স্পেনে বৈধতার জন্য প্রায় ১২ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীর আবেদন জমা পড়ার তথ্য সামনে এসেছে।
পাঁচ দেশের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি, সংশ্লিষ্ট দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়াসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে। ফলে ২০২৭ সালে সত্যিই অভিবাসীদের স্থানান্তর শুরু করা সম্ভব হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে আসন্ন আলোচনা ও চুক্তিগুলোর ওপর।
