বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ার দিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই ২ শতাংশের বেশি নেমে যায়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.০৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১.৭১ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ২.১৪ শতাংশ কমে ৯৮.১৫ ডলারে নেমে আসে। একপর্যায়ে তেলের দাম ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা এবং অঞ্চলটি থেকে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে আসায় বাজারে এর প্রভাব পড়ে।
এর আগে জুনেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। সে সময় পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। বিস্তারিত পড়ুন—বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, লিটারে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি।
দেশে একই দিনে লিটারে বাড়ল ২০ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার এই দিনেই বাংলাদেশে নতুন জ্বালানি তেলের দাম কার্যকর হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন—প্রতিটির দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।
নতুন হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
| জ্বালানি | আগের দাম | নতুন দাম | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| ডিজেল | ১১৫ টাকা | ১৩৫ টাকা | ২০ টাকা |
| কেরোসিন | ১৩৫ টাকা | ১৫৫ টাকা | ২০ টাকা |
| পেট্রোল | ১৪০ টাকা | ১৬০ টাকা | ২০ টাকা |
| অকটেন | ১৪৫ টাকা | ১৬৫ টাকা | ২০ টাকা |
তবে বাংলাদেশের খুচরা মূল্যবৃদ্ধি এবং সোমবারের আন্তর্জাতিক বাজারের দৈনিক দরপতন দুটি ভিন্ন সময়সীমার ঘটনা। সরকার বলছে, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সরকার।
রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে নতুন মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
কেন বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম
সোমবারের দরপতনের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার প্রত্যাশা বাজারে তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ নিয়ে যে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা ছিল, সাম্প্রতিক তথ্য সেই উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানিও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের রপ্তানি দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি পর্যায়ে উঠেছে; আগস্টে তা একপর্যায়ে দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেলে নেমেছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ফলে এক দিনের দরপতনকে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতা হিসেবে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করতে পারে।
চলতি বছরের শুরুতে অবশ্য উল্টো চিত্র ছিল। জানুয়ারিতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়েছিল। পড়ুন—জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২ টাকা কমল।
বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশে কি কমবে?
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য শুধু কোনো একটি দিনের আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর নির্ভর করে না। আমদানি মূল্য, পরিশোধন ব্যয়, পরিবহন ও ফ্রেইট, বিনিময় হার, কর এবং বিপিসির আর্থিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত খুচরা মূল্যে প্রভাব ফেলে।
ফলে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমলেও সেটির প্রভাব বাংলাদেশের খুচরা বাজারে একই দিনে পড়ার বিষয় নয়। সরকার সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আগের কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের চাপকে সামনে এনেছে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেছেন, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
