সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ

cyprus-bangladeshi-student

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের লারনাকা শহরে নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিন পর শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২) নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। গত রোববার লারনাকার কোফিনু এলাকার একটি স্থানে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১১ জুন রাত থেকে তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। প্রায় তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে যান তিনি। সেখানে লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন এবং পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কাজ খুঁজছিলেন, যাতে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমানো যায়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার দিন বিকেলে শাহরিয়ার তাঁর মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন। তিনি জানান, একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে এবং ওই রাতেই নাইট ডিউটিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন। বিষয়টি তিনি তাঁর বাবা এবং সাইপ্রাসে থাকা রুমমেট রায়হান মিয়াকেও জানান। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে কাজের স্থানে পৌঁছে তিনি রায়হানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠান। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পরিবারের অভিযোগ, শাহরিয়ারের নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর নিজের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই বাবা নাসির মিয়ার কাছে মুক্তিপণ দাবি করে বার্তা পাঠানো হয়। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা ৩৫ হাজার ইউরো দাবি করে এবং টাকা না দিলে ক্ষতির হুমকি দেয়। প্রথমে পরিবার মনে করেছিল, হয়তো তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ আইডি হ্যাকড হয়েছে। কিন্তু পরদিন কাজ থেকে না ফেরায় উদ্বেগ আরও বাড়ে।

এরপর রুমমেট রায়হান মিয়া স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট করেন। পুলিশ শাহরিয়ারের পাঠানো লোকেশনেও যায়, তবে তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজ থাকার সময়েও শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর অনলাইনে সক্রিয় ছিল এবং বারবার টাকা দাবি করা হচ্ছিল।

শাহরিয়ারের ভাই নয়ন আহমেদ জানান, একপর্যায়ে পরিবার মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে রাজি হয়। দর-কষাকষির পর বাংলাদেশি পাঁচ লাখ টাকায় বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু টাকা পাঠানোর আগে তারা শাহরিয়ারের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাইলে অপর পক্ষ রাজি হয়নি। পরে ফেসবুক ও সাইপ্রাসে থাকা পরিচিতদের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, পুলিশ শাহরিয়ারের লাশ উদ্ধার করেছে।

সাইপ্রাস পুলিশের বরাত দিয়ে স্বজনেরা জানান, শাহরিয়ার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শাহীন বাবু (২২) নামের এক বাংলাদেশি তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাশ এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তির বাংলাদেশের বাড়ি কোথায়, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত শাহরিয়ারের মা পাপিয়া বেগম ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চান তিনি। পরিবারের সদস্যরা এখন দ্রুত মরদেহ দেশে আনা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।

রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, সাইপ্রাসে পড়তে যাওয়া রায়পুরার শাহরিয়ার নামের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের খবর তিনি পেয়েছেন। তবে সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এখনো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদেশে নতুন জায়গায় চাকরি, বাসস্থান বা পরিচিত কারও মাধ্যমে কাজের সুযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।