ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১ হাজার ৬৬৮ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা, আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি এবং সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতার ওপর নানা বিধিনিষেধকে প্রাণহানি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিহত বা নিখোঁজদের মধ্যে ৮৭২ জন সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রাণ হারিয়েছেন। এই রুটের অন্যতম প্রধান পথ হলো উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপ হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা।
যাত্রাপথে বাংলাদেশির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপমুখী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এনজিও এসওএস মেদিতেরানের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই রুটে যাত্রা করা অভিবাসীদের ২৬ শতাংশ বাংলাদেশি। এরপর রয়েছেন ইরিত্রিয়ার নাগরিক ১৬ শতাংশ, সুদানের ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ শতাংশ এবং মিশরের ৯ শতাংশ।
২০১৬ সাল থেকে নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, গিনি ও মালি থেকেও এই পথে ইউরোপমুখী অভিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
লিবিয়া এখনো ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান ট্রানজিট ও যাত্রার দেশ। ৯ আগস্ট প্রকাশিত এনজিও অ্যালার্ম ফোনের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইউরোপে পৌঁছাচ্ছেন কম, প্রাণ হারাচ্ছেন বেশি
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে লিবিয়া ও টিউনিশিয়া হয়ে ২৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে। তবে একই সময়ে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েছে।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষক আরনো বানসের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহির্সীমান্তে অভিবাসীদের যাত্রা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ফলে সমুদ্রপথের যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর ফলে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা কমলেও সমুদ্রে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
নতুন রুটে বাড়ছে ঝুঁকি
লিবিয়ার পশ্চিম উপকূলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় অভিবাসীদের একটি অংশ এখন পূর্বাঞ্চলের তব্রুক রুট ব্যবহার করছেন। এই পথ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে যায়।
রুটটি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ। আরনো বানসের মতে, এই পথে ইউরোপে পৌঁছাতে আগের তুলনায় যাত্রার দূরত্ব তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
গত ১৩ ও ১৪ জুলাই তব্রুকের উপকূলে দুটি নৌকা ডুবে যায়। একটি নৌকায় প্রায় ৬০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় ৩০ জন অভিবাসী ছিলেন। এসব ঘটনায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ হন।
বছরের শুরুতেই প্রাণহানি বেশি
চলতি বছরের শুরু থেকেই ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপথে প্রাণহানি ছিল বেশি। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারিতেই প্রায় ৪৬০ জন অভিবাসী মারা গেছেন।
তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঝড় হ্যারির আঘাতের সময় টিউনিশিয়া থেকে প্রায় ৩০টি নৌকা সমুদ্রে যাত্রা করেছিল। কয়েকটি এনজিওর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ হাজার অভিবাসী নিখোঁজ হন।
খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও অভিবাসীদের সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার পেছনে ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা এবং স্থলপথে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্ধারকারী জাহাজ নিয়েও বিতর্ক
সমুদ্রে বিপদে পড়া অভিবাসীদের উদ্ধারে নিয়োজিত মানবিক জাহাজগুলোর কার্যক্রমে বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে এনজিওগুলো।
ইতালিতে ২০২৩ সালে কার্যকর হওয়া পিয়ান্তেদোসি ডিক্রি অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযান শেষ করার পর মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে নির্ধারিত বন্দরের দিকে রওনা হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব বন্দর উদ্ধার ও অনুসন্ধান এলাকার (এসএআর জোন) কাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
এতে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর দাবি, উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয় এবং তাদের শত শত কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা অভিবাসী জাহাজে থাকলেও অনেক সময় এই নিয়মের কারণে দ্রুত উদ্ধার এলাকায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয় না।
এসওএস মেদিতেরানের অপারেশন পরিচালক সোয়াজিক দুপুইয়ের দাবি, পিয়ান্তেদোসি ডিক্রির কারণে তাদের উদ্ধার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে ৭১ বার দূরবর্তী বন্দরের দিকে যেতে বাধ্য করা হয়। এতে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৫০৯ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
লিবিয়ার কোস্টগার্ড নিয়েও অভিযোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় লিবিয়ার কোস্টগার্ডের মাধ্যমে অভিবাসীদের আটকানো ও সমুদ্রপথে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর নীতিও বিভিন্ন মানবাধিকার ও অভিবাসন সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এনজিও অ্যালার্ম ফোনের অভিযোগ, গত ছয় মাসে অভিবাসীবাহী নৌকা ও মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলো লিবিয়ার বাহিনী এবং বিভিন্ন মিলিশিয়ার হামলার শিকার হয়েছে।
জার্মান এনজিও সি-ওয়াচও অভিযোগ করেছে, মে মাসে লিবিয়ার কোস্টগার্ড তাদের সি-ওয়াচ ৫ জাহাজের ক্রুদের লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালায়। ওই সময় জাহাজটির কর্মীরা সমুদ্রে প্রায় ৯০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে সহায়তা করছিলেন।
ভূমধ্যসাগরে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হয়ে উঠেছে—ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করা মানুষের সংখ্যা কমলেও বিপজ্জনক যাত্রা ও প্রাণহানি কমছে না। বরং কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প রুটের কারণে অনেক অভিবাসী আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিও।
