পর্তুগালে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনায় অনেকের প্রথম চিন্তা থাকে একটি বাড়ি কেনা। নিজের ঠিকানা থাকলে অনিশ্চয়তা কমবে এবং দেশটিতে স্থায়ী হওয়ার পথ সহজ হবে—এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের। তবে অভিবাসন ও আবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিসা পাওয়ার আগে বাড়ি কেনা সব ক্ষেত্রে সুবিধাজনক নয়। বরং ভিসার ধরন ও আইনি প্রক্রিয়া না বুঝে সম্পত্তি কিনলে পুরো স্থানান্তর পরিকল্পনাই জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, পর্তুগালে বাড়ি কিনলেই দেশটিতে বসবাসের অধিকার পাওয়া যায়। বাস্তবে কেবল সম্পত্তি কেনার মাধ্যমে এখন আর নতুন করে ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা বিনিয়োগভিত্তিক আবাসনের যোগ্যতা অর্জন করা যায় না।
২০২৩ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া আইনে সম্পত্তি কেনাসহ কয়েকটি পুরোনো বিনিয়োগপথে নতুন গোল্ডেন ভিসার আবেদন বন্ধ করা হয়। বর্তমানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গবেষণায় অর্থায়ন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিনিয়োগ, অনাবাসন খাতের নির্দিষ্ট তহবিল এবং পর্তুগিজ কোম্পানিতে নির্ধারিত বিনিয়োগের মতো পথ এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
বাড়ি কেনার আগে ভিসা, নাকি ভিসার আগে বাড়ি?
এখন প্রশ্ন হলো—কোনটি আগে করা উচিত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কোনো একক উত্তর নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির প্রয়োজন ও পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।
গোল্ডেন ভিসার জন্য: যারা এই পথে যেতে চান, তাদের জন্য বাড়ি কেনার আগে ভিসার প্রক্রিয়া বুঝে নেওয়া জরুরি। কারণ বাড়ি কেনা এখন আর এই ভিসার যোগ্যতা দেয় না।
ডি৭ ভিসার জন্য: এই ভিসাটি মূলত প্যাসিভ ইনকাম (যেমন—পেনশন, ভাড়া, লভ্যাংশ) যাদের আছে, তাদের জন্য। ২০২৬ সালে একজন আবেদনকারীর জন্য মাসিক আয় হতে হবে কমপক্ষে ৯৮০ ইউরো। এই ভিসার জন্য বাড়ি কেনা বাধ্যতামূলক নয়, বরং পর্তুগালে থাকার ব্যবস্থা (ভাড়া বা নিজের বাড়ি) দেখাতে হবে।
ডিজিটাল নম্যাড ভিসা (ডি৮) জন্য: যারা দূরবর্তী কাজ করেন, তাদের জন্য এই ভিসা। ২০২৬ সালে মাসিক আয় হতে হবে ৩ হাজার ৬৮০ ইউরো। এই ভিসার জন্যও বাড়ি কেনা আবশ্যক নয়।
আগে বাড়ি কিনলে যেসব ঝুঁকি
ভিসার ধরন নির্ধারণের আগেই বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সম্পত্তি কিনলে কর, সম্পত্তির মালিকানা কাঠামো, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং অর্থ স্থানান্তর নিয়ে অপ্রত্যাশিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্রেতা বাড়ি কেনার পর জানতে পারেন, যে ভিসার জন্য তাঁরা আবেদন করবেন, সেখানে সম্পত্তির মালিকানা প্রয়োজনই ছিল না।
এ কারণে সম্পত্তির প্রাথমিক চুক্তি বা অর্থ পরিশোধের আগে অভিবাসন আইনজীবী, কর পরামর্শক ও নিবন্ধিত আবাসন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। কোন ব্যক্তির নামে সম্পত্তি কেনা হবে, অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং ভবিষ্যতে বাড়িটি বিক্রি বা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরের পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়ও আগেই বিবেচনায় রাখা দরকার।
বাজারেও বাড়ছে চাপ
পর্তুগালের আবাসনবাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা আইএনইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পর্তুগালে বাড়ির দাম আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং লেনদেনের সংখ্যা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
এমন বাজারে উপযুক্ত সম্পত্তি খোঁজা, আইনি নথি যাচাই, মূল্য নিয়ে আলোচনা এবং দলিল সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে। তাই ভিসার সম্ভাব্য সময়সূচির সঙ্গে বাড়ি কেনার পরিকল্পনার সমন্বয় না থাকলে আবেদনকারীকে অতিরিক্ত ভাড়া, কর বা ভ্রমণ ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
কার জন্য কোন সিদ্ধান্ত
অনেক ভবিষ্যৎ বাসিন্দার জন্য আগে ভিসা নিয়ে পর্তুগালে গিয়ে কিছুদিন ভাড়া বাসায় থাকা বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে লিসবন, পোর্তো, আলগারভ, ব্রাগা বা দেশের অন্য অঞ্চলের জীবনযাপন, যোগাযোগব্যবস্থা ও ব্যয় সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট বিনিয়োগভিত্তিক আবাসনপথ বেছে নেওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিসার আবেদন ও বিনিয়োগের কাঠামো একই সময়ে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই সবার জন্য একই সিদ্ধান্ত কার্যকর নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্তুগালে স্থানান্তর মানে শুধু জিনিসপত্র নিয়ে নতুন দেশে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে অভিবাসন আইন, কর, ব্যাংকিং, আবাসন ও পারিবারিক পরিকল্পনার বিষয় যুক্ত। এসব দিক যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিলে বাড়ি কেনা নতুন জীবনের পথে বাধা না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
