যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলের সংখ্যা ও সেখানে থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে হোটেল থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের সরিয়ে অন্য ধরনের অস্থায়ী আবাসনে স্থানান্তর, আবাসনের মান, আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তি এবং অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে দেশটির ১৬০টি হোটেলে ১৬ হাজার ২১ জন আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন। এক বছর আগে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৪১ জন। আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ১৮ জনে পৌঁছেছিল।
সরকারের দাবি, আশ্রয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ফলে হোটেলের ওপর চাপ কমেছে। পাশাপাশি হোটেল থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের একাধিক পরিবারের বসবাসের উপযোগী ব্যক্তিগত ভাড়া বাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের ভাগাভাগি আবাসনে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
চলতি সংসদীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হোটেল বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। চলতি মাসের শুরুতে আরও ১৩টি হোটেলের ব্যবহার বন্ধ করার কথা জানানো হয়।
তবে হোটেলের সংখ্যা কমলেও অস্থায়ী আবাসনে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। সর্বশেষ হিসাবে, যুক্তরাজ্যে মোট ৬৯ হাজার ৩৮ জন আশ্রয়প্রার্থী অস্থায়ী আবাসনে রয়েছেন। এসব আবাসনের জীবনযাত্রার মান এবং স্থানীয় এলাকাগুলোতে এর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
হোটেল থেকে অন্য ধরনের আবাসনে স্থানান্তরের ফলে আশ্রয় ব্যবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ও ৮ শতাংশ কমেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, এসব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে সরকার সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করছে। তাঁর দাবি, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে আশ্রয়ের আবেদন জমে থাকা সংখ্যা কমেছে, হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে এবং নির্বাসন ও ফেরত পাঠানোর সংখ্যাও বেড়েছে।
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি কমলেও বিতর্ক রয়ে গেছে
যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে প্রবেশের ঘটনাও এক বছরে ২৩ শতাংশ কমেছে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তার বৃদ্ধি এবং ফরাসি পুলিশের নৌকা আটকানোর সংখ্যা বাড়ার কারণে এই প্রবণতা দেখা গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময় ফ্রান্সের সঙ্গে একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর আওতায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করা কিছু অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে অন্য কিছু মানুষের জন্য নিরাপদ ও বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল। এটি ‘একজন ফেরত, একজন প্রবেশ’ নীতি হিসেবে পরিচিত।
তবে এই ব্যবস্থায় ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সময় আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবস্থা চালুর পর থেকে মোট ২১০টি ঘটনায় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮১টি ঘটনায় শারীরিক নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
দাতব্য সংস্থাগুলো দাবি করেছে, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সময় কিছু আশ্রয়প্রার্থী আহত হওয়ার ঘটনাও তারা নথিবদ্ধ করেছে।
শাবানা মাহমুদ বলেছেন, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি ঠেকাতে সরকারকে এখনো আরও কাজ করতে হবে।
আশ্রয়ের আবেদনের জট নিয়ে নতুন উদ্বেগ
হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমলেও আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির নুনি ইয়র্গেনসের মতে, দ্রুত আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে সরকার অনেক হোটেল খালি করতে পেরেছে। তবে এখন আদালতে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন জমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ, হোটেলের সংখ্যা কমলেও পুরো আশ্রয় ব্যবস্থার চাপ কমেছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
অভিবাসী কর্মীদের স্পনসর লাইসেন্স বাতিল বাড়ছে
এদিকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়ছে।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্য এবং ত্রৈমাসিক অভিবাসন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে অভিবাসী কর্মীদের স্পনসর করার লাইসেন্স বাতিল হয়েছে ৪ হাজার ৪০৩টি। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮২৮টি।
ব্রেক্সিটের পর স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যার মতো খাতে কর্মীর ঘাটতি পূরণে দক্ষ কর্মীদের স্পনসর করার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই ব্যবস্থার কারণে কিছু কর্মী নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
তাদের অভিযোগ, অভিবাসন মর্যাদা চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ নিয়ে কিছু নিয়োগকর্তা কর্মীদের কম বেতন দেওয়া বা অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর মতো অনিয়ম করতে পারেন।
আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার নিয়ে জাতিসংঘের সুপারিশ
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দেশটির মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইকুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিশন জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষায় সরকার জাতিসংঘের দেওয়া কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে এবং দারিদ্র্য ও চরম অসহায়ত্ব থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার শরণার্থীদের চাকরির বাজারে প্রবেশে সহায়তা করা একটি কর্মসূচিও বন্ধ করে দিয়েছে। ওই কর্মসূচিতে জীবনবৃত্তান্ত তৈরি ও চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির মতো বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হতো।
এ ছাড়া চরম দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের ঝুঁকিতে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করার আইনি দায়িত্বও সরকার বাতিল করেছে বলে মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে।
ইকুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিশনের চেয়ার মেরি-অ্যান স্টিফেনসন বলেন, সরকার যখন একটি গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন সবার অধিকারই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা দ্রুত কমলেও দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। হোটেলের পরিবর্তে অন্য অস্থায়ী আবাসনে স্থানান্তর, আশ্রয়ের আবেদন ও আপিলের জট, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি এবং অভিবাসী কর্মীদের অধিকার—সব মিলিয়ে অভিবাসন নীতি এখনো ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়।
