যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরেও অভিবাসন অভিযান, নতুন নির্দেশে আটক হচ্ছেন অনথিভুক্ত অভিবাসীরা

us-airport-immigration

যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের নতুন পর্ব শুরু হয়েছে বিমানবন্দরগুলোতে। নতুন এক নির্দেশনার আওতায় দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এখন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাতায়াতকারী অনথিভুক্ত অভিবাসীদেরও বিমানবন্দরে আটক করছে।

১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম EL PAÍS জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ২৫ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তারা এক ডজনেরও বেশি দেশের নাগরিক। অন্তত ১৫টি বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের এমন অভিযান চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটেও বাড়ছে নজরদারি

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, দেশটিতে অনিয়মিত অবস্থানরত বিদেশিদের অভ্যন্তরীণ আকাশপথে চলাচলের সুযোগ দেওয়া একটি নীতি বাতিল করা হয়েছে।

ডিএইচএসের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনথিভুক্ত বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিমানে ভ্রমণের সুযোগ না দিয়ে তাদের দেশত্যাগের দিকে ঠেলে দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে নতুন নির্দেশনা ঠিক কবে থেকে কার্যকর হয়েছে এবং কোন কোন বিমানবন্দরে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণত সাদা পোশাকে থাকা অভিবাসন কর্মকর্তারা যাত্রীদের ফ্লাইটের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের সময় অথবা বোর্ডিং এলাকায় আটক করছেন।

আইসিইর নজরে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ব্যক্তিরাও

নতুন অভিযানের আওতায় শুধু দীর্ঘদিন ধরে অনথিভুক্ত অবস্থায় থাকা ব্যক্তিরাই নন, বরং অভিবাসন সংক্রান্ত আবেদন বা কাগজপত্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন।

কলোরাডোর ডেনভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০ জুলাই ইকুয়েডরের নাগরিক ২৭ বছর বয়সী এক নারীকে ফেডারেল কর্মকর্তারা আটক করেন। তার আইনজীবীর দাবি, তিনি বৈধ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং দেশটিতে থাকার অনুমতির জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে ডিএইচএসের ভাষ্য, তিনি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। পরে ৩০ জুলাই তিনি বন্ডে মুক্তি পান।

নেভাদার লাস ভেগাসের হ্যারি রিড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ভিয়েতনামের এক নাগরিককে আটক করার ঘটনা সামনে এসেছে। তার ভিসার মেয়াদ ২০১৫ সালে শেষ হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই ধরনের ঘটনায় সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ইউক্রেনের এক নারী আটক হন। ক্যালিফোর্নিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত ১১ জন অভিবাসী আটক হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমানবন্দরকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ

অভিবাসন আইনজীবীদের মতে, বিমানবন্দরে অভিযান পরিচালনা করলে কর্তৃপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আটক করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। কারণ ফ্লাইটের সময় ও বিমানবন্দরে উপস্থিতির বিষয়টি আগে থেকেই জানা যায়।

অভিবাসন আইনজীবী অ্যালেক্স গালভেজের মতে, বিমানবন্দরে প্রবেশের মাধ্যমে একজন যাত্রীর পরিচয় ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন সরকারি ব্যবস্থার নজরে আসতে পারে। ফলে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রাও এখন আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইসিই ও টিএসএর সহযোগিতা বাড়ছে

বিমানবন্দরে অভিবাসন তৎপরতার ক্ষেত্রে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এবং ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (টিএসএ) মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে দেশটির একাধিক বিমানবন্দরে টিএসএর জনবল সংকটের সময় আইসিই কর্মকর্তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে টিএসএর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ৮০০ জনের বেশি মানুষ আইসিই হেফাজতে গেছেন বলে রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দিনে ২ হাজার আটকের লক্ষ্য

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার অভিবাসন-সংক্রান্ত আটকের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর ফলে আগে অগ্রাধিকার তালিকার বাইরে থাকা অনেক অভিবাসীও এখন আটকের ঝুঁকিতে পড়ছেন।

বিশেষ করে যাদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন, অভিবাসন স্ট্যাটাসের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বা অন্যান্য কাগজপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে অনিয়মিত অবস্থানরত বিদেশিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ জোরদার করা। অন্যদিকে অভিবাসন আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে বিমানবন্দরে এমন অভিযান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের বিষয়টিও এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।