বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষাগত ও বিশেষ দক্ষতা অর্জনে আগ্রহীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে এক হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ তহবিলের আওতায় ঋণের সুদের হার হবে ৯ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেকর্ড প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক তথ্যেও এই রেকর্ড রেমিট্যান্সের চিত্র উঠে এসেছে।
তবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ এখনো স্বল্প দক্ষতা বা অদক্ষ পেশায় নিয়োজিত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন।
১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার তহবিল সরবরাহ করবে।
এই অর্থ ব্যবহার করে বিদেশগামী কর্মীদের প্রয়োজনীয় ভাষা ও বিশেষ দক্ষতা অর্জনে ঋণ দিতে পারবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য অপ্রচলিত শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাপানের মতো দেশে অনেক চাকরির ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট পর্যায়ের জাপানি ভাষার দক্ষতা প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি PortuBangla-তে প্রকাশিত “সরকারিভাবে জাপানে নার্সিং কেয়ারগিভার পদে নারী কর্মী নিয়োগ” প্রতিবেদনে আবেদনকারীদের জাপানি ভাষায় জেএলপিটি-এন৪ অথবা জেএফটি বেসিক পর্যায়ের দক্ষতা থাকার শর্তের কথা জানানো হয়েছিল।
সর্বোচ্চ ঋণ ১০ লাখ টাকা
নতুন তহবিলের আওতায় একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।
সর্বশেষ তথ্যে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ সীমার পুরো অর্থ পাবেন কি না, তা তার প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, গন্তব্য দেশ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
এর আগে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ভাষাশিক্ষা ও বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের একটি কর্মসূচি চালু করেছিল। তখন ঋণের বার্ষিক সুদের হার ছিল ১১ শতাংশ এবং মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নতুন এক হাজার কোটি টাকার তহবিলের আওতায় সুদের হার কমে ৯ শতাংশ হচ্ছে।
ঋণের টাকা সরাসরি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা
ঋণের অর্থ অপব্যবহার ঠেকাতে অর্থ সরাসরি আবেদনকারীর হাতে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম জানিয়েছেন, জাপানে ভাষা শিক্ষার জন্য কেউ ঋণ নিলে তার পুরো অর্থ সরাসরি ব্যক্তির হিসাবে দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি ব্যাংক সরাসরি পরিশোধ করবে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজেই ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, ভাষা শিখতে ১০ লাখ কেন?
তবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারপারসন এম এস শেকিল চৌধুরী মনে করেন, শুধু ভাষা শিক্ষার জন্য এত বড় অঙ্কের ঋণসীমা বাস্তবসম্মত কি না তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তার মতে, সর্বোচ্চ ঋণসীমা অনেক বেশি রাখা হলে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই দেশ, ভাষা কোর্স এবং প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
রেকর্ড ৩৫.৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রায় ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশ এসেছে।
PortuBangla-এর “প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে শীর্ষ ১০ দেশ” প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক রেমিট্যান্সের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
কেন ভাষা শেখায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান। কিন্তু ভাষা ও কারিগরি দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই কম মজুরির পেশায় কাজ করতে বাধ্য হন।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি ও চীনের মতো দেশে কাজ কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার দক্ষতা বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।
সরকারও বিদেশি ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কারিগরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি, জাপানি, ইতালীয়, কোরিয়ান, আরবি ও মান্দারিনসহ বিভিন্ন ভাষা শেখানোর জন্য ভাষা ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন তহবিল বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ নির্ধারণ করা জরুরি।
কারণ ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে একজন কর্মী উচ্চ আয়ের চাকরিতে যেতে পারলে তার পাঠানো রেমিট্যান্সও বাড়তে পারে। বিপরীতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ দিলে বিদেশগামী কর্মীর ঋণের বোঝা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফলে এক হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ তহবিল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঋণ বণ্টন, প্রশিক্ষণের মান এবং অর্থ ব্যবহারের ওপর।
