ইইউ গণভোটে আগ্রহ বাড়ছে আইসল্যান্ডে, রেকিয়াভিকে দুপুরেই ভোট পড়ল ১৪ শতাংশ

iceland-eu-referendum-reykjavik-voting.

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না—এ বিষয়ে আইসল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে ভোটারদের আগ্রহের প্রাথমিক চিত্র পাওয়া গেছে। দেশটির রাজধানী রেকিয়াভিকে স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর পর্যন্ত গত ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের একই সময়ের তুলনায় বেশি ভোট পড়েছে।

প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, রেকিয়াভিক নর্থ নির্বাচনী এলাকায় দুপুর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে একই সময় ভোট দিয়েছিলেন ১০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ।

রেকিয়াভিক সাউথ এলাকায় দুপুর পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১৪ শতাংশের কিছু বেশি। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে একই সময়ে এই হার ছিল ১১ শতাংশের কিছু বেশি।

আইসল্যান্ডের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরইউভি জানিয়েছে, ভোটের দিন আসার আগেই ২০ শতাংশের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

ইইউতে যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরু করা নিয়ে গণভোটে ফলাফল খুব কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার ইইউর সঙ্গে যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার এর বিরোধিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।

ইইউপন্থীরা মনে করেন, ইউরোপের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডের জন্য লাভজনক হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সীমান্ত অতিক্রমকারী সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ইউরোপীয় সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।

তাদের আরেকটি যুক্তি হলো, ইইউর অভিন্ন মুদ্রা ইউরো গ্রহণ করলে আইসল্যান্ডের অস্থির ক্রোনা মুদ্রার তুলনায় অর্থনীতিতে আরও স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

তবে ইইউবিরোধীদের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থাই আইসল্যান্ডের জন্য যথেষ্ট। তাদের মতে, পূর্ণ সদস্য না হয়েও দেশটি ইউরোপীয় একীভূত ব্যবস্থার বেশির ভাগ সুবিধা পাচ্ছে এবং এর বিনিময়ে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দিতে হচ্ছে না।

রেকিয়াভিকের সিটি হলে ভোট দেওয়ার পর ৭১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত উনুর ইয়োকুলসদোত্তির বলেন, আইসল্যান্ডের আরও বড় একটি ঐক্যের অংশ হওয়া উচিত এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা মূল্যবান।

অন্যদিকে ৫৩ বছর বয়সী মাছ ব্যবসায়ী ওলাফুর থরসন ইইউ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, একসময় তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পছন্দ করলেও এখন এটি তার কাছে বড় অর্থনৈতিক কারাগারের মতো মনে হয়।

২০০৯ সালের সংকটের পর ইইউতে যোগদানের আবেদন

প্রায় চার লাখ মানুষের দেশ আইসল্যান্ড ২০০৯ সালের ভয়াবহ আর্থিক সংকটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের জন্য আবেদন করেছিল। ওই সংকটে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে ২০১৩ সালে ইইউবিরোধী একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়।

এবার গণভোটে ইইউর সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে ভোট পড়লে ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। সেখানে অর্থনীতি থেকে শুরু করে মানবাধিকার পর্যন্ত ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মৎস্যসম্পদ

ইইউর সঙ্গে আলোচনায় আইসল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে মৎস্যসম্পদ। দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই খাতের ওপর নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় রেকিয়াভিক।

তবে এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন মৎস্যসম্পদ নিয়ে আইসল্যান্ডের অবস্থানের বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি ছাড় দিতে প্রস্তুত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও বদলেছে নিরাপত্তা ভাবনা

ইউরোপে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর আইসল্যান্ডের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ও প্রতিবেশী গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি।

আইসল্যান্ড কৌশলগতভাবে উত্তর মেরু-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী নেই। প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে তারা ন্যাটো এবং ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

ফলে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়টি শুধু অর্থনীতি নয়, আইসল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

গণভোটের ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ ও ইইউর বাজেটে নিট অবদান রাখতে সক্ষম একটি দেশ সদস্যপদের দিকে এগিয়ে আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে ইউরোপের।