পর্তুগালের নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করতে নতুন বিধিমালা অনুমোদন করেছে দেশটির সরকার। নতুন আইনে সাধারণভাবে নাগরিকত্বের জন্য বসবাসের ন্যূনতম সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বা দশ বছর করা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকারীদের পর্তুগিজ ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান প্রমাণ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পর্তুগালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন জাতীয়তা আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি ডিক্রি-আইন অনুমোদন করা হয়। সরকারের প্রকাশিত বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, দেশটির গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নীতির প্রতি আনুগত্য ঘোষণা এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৬ সালের ১৯ মে পর্তুগালের সংশোধিত জাতীয়তা আইন কার্যকর হয়। তবে আইনের বিভিন্ন শর্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণে অতিরিক্ত বিধিমালার প্রয়োজন ছিল।
নাগরিকত্ব পেতে বাংলাদেশিদের ১০ বছর বসবাসের শর্ত
সংশোধিত আইনে সাধারণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্বের আবেদন করতে পর্তুগালে বৈধভাবে বসবাসের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
পর্তুগিজভাষী দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর নাগরিকদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাত বছরের বৈধ বসবাসের শর্ত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সাধারণভাবে অন্তত ১০ বছর বৈধভাবে বসবাস করতে হবে।
এর আগে সাধারণ নাগরিকত্ব আবেদনের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের বৈধ বসবাসের শর্ত ছিল। ফলে নতুন নিয়মে অনেক বিদেশি নাগরিককে আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
তবে ১৯ মে ২০২৬-এর আগে জমা দেওয়া এবং ওই দিন পর্যন্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে আগের আইনের বিধান প্রযোজ্য হবে।
পর্তুগিজ ভাষা ও ইতিহাসের জ্ঞান যাচাই
নতুন বিধিমালায় নাগরিকত্বের জন্য ভাষাগত ও সামাজিক জ্ঞান যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের পর্তুগিজ ভাষার পাশাপাশি দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় প্রতীক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে।
এ ছাড়া পর্তুগালের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কেও ধারণা থাকার শর্ত যুক্ত হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, পরীক্ষা ও সনদের মাধ্যমে এসব যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
তবে পরীক্ষার নির্দিষ্ট ধরন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিস্তারিত শর্ত নতুন বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও দিতে হবে
নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের নিজেদের জীবনযাপনের ব্যয় বহন করার সক্ষমতা দেখাতে হবে।
নতুন আইনে পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য থাকার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আবেদনকারীদের পর্তুগালের গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের মৌলিক নীতিগুলো মেনে চলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও থাকবে।
তবে আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের জন্য কত আয় বা সঞ্চয় প্রয়োজন হবে এবং কী ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হবে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি
নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত কঠোর করার পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার ঘোষণা দিয়েছে পর্তুগাল সরকার।
নতুন বিধিমালায় সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে আবেদনকারীদের এমন কিছু নথি বারবার সংগ্রহ করতে না-ও হতে পারে, যেগুলো ইতোমধ্যে পর্তুগালের সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে রয়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্সি মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো জানিয়েছেন, জাতীয়তা আইনের সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো আবেদনকারীদের সঙ্গে পর্তুগালের কার্যকর সম্পর্ক ও একীভূত হওয়ার যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
সরকার আশা করছে, ডিজিটাল সেবা উন্নত হলে প্রশাসনিক জটিলতা এবং আবেদন নিষ্পত্তির বিলম্ব কমবে। তবে নাগরিকত্বের আবেদন কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
AIMA-র নতুন সভাপতি সিজার তেইশেইরা
জাতীয়তা আইনের বিধিমালা অনুমোদনের পাশাপাশি পর্তুগালের অভিবাসন সংস্থা এজেন্সি ফর ইন্টিগ্রেশন, মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম (AIMA)-এর নতুন সভাপতি নিয়োগের সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার।
২৯ অক্টোবর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংস্থাটির নতুন সভাপতি হচ্ছেন সিজার নুনো দা কস্তা তেইশেইরা। তিনি পেদ্রো পর্তুগাল গাসপারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।
২০২৩ সালে সাবেক অভিবাসন সংস্থা SEF বিলুপ্তির পর প্রতিষ্ঠিত AIMA সম্প্রতি তিন বছর পূর্ণ করেছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আগের বছরের তুলনায় AIMA-র অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন সেবা, অভিবাসীদের সহায়তা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে মাইগ্রেশন টেকনিশিয়ানদের সংগঠন STM জানিয়েছে, শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করে সংস্থাটির দীর্ঘদিনের জনবলসংকট ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
নতুন বিধিমালা কবে কার্যকর হবে?
পর্তুগালের সংশোধিত জাতীয়তা আইন ১৯ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর রয়েছে। তবে ২৯ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন বাস্তবায়ন বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো সরকারি গেজেট Diário da República-তে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
তাই নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি, আর্থিক প্রমাণের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে, তা জানতে চূড়ান্ত প্রকাশিত বিধিমালা দেখতে হবে।
বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিক পর্তুগালের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য আবেদনের তারিখ, বৈধ বসবাসের সময় গণনা এবং নতুন শর্তগুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ।
