ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখল যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট

us-supreme-court-birthright-citizenship

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) বহাল রেখে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এ রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জারি করা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার নির্বাহী আদেশ কার্যকর হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বা অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত অভিবাসীদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুরাও সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার আওতায় জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করবে।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রদান করেন। তার সঙ্গে একমত হন উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কাগান ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এবং রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট। বিচারপতি ব্রেট কাভানাহ আংশিক ভিন্নমত দিলেও রায়ের সঙ্গে একমত হন। অন্যদিকে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গরসাচ ভিন্নমত পোষণ করেন।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, “যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির বিচারিক এখতিয়ারের আওতাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিক।”

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল

দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে অবৈধ বা অস্থায়ী অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ নেন। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU) সেই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে।

এ বছরের এপ্রিলে মামলার শুনানিতে ACLU-এর আইনজীবী সিসিলিয়া ওয়াং যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির নাগরিকত্ব দেশটির দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক নীতি এবং এটি সংবিধানের ভাষা ও ইতিহাস দ্বারা সুরক্ষিত।

সুপ্রিম কোর্ট রায়ে ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গৃহীত সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর গুরুত্ব তুলে ধরেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮৫৭ সালের কুখ্যাত ড্রেড স্কট রায় বাতিল করা হয়, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, নাগরিকত্ব তখনও এবং এখনও “সব অধিকার পাওয়ার অধিকার”। তিনি বলেন, ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা এই দেশের মাটিতে স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য সেই অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং আদালত আজও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।

সহমত পোষণ করে বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে রক্তের সম্পর্ক নয়, সংবিধানের সমতার নীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস দাবি করেন, ১৪তম সংশোধনী মূলত গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হয়েছিল এবং এটি বিদেশি অস্থায়ী অভিবাসীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।

বিচারপতি ব্রেট কাভানাহ মত দেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন না করলেও এটি বিদ্যমান ফেডারেল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, কংগ্রেস চাইলে ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়ন করে এ বিষয়ে পরিবর্তন আনতে পারে, তবে বর্তমানে এমন কোনো আইন নেই।

অভিবাসন নীতিতে বড় প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রায় ১৬০ বছরের সাংবিধানিক নীতিকে আরও শক্তিশালী করল। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও আদালতে টিকল না।

এ রায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: সিএনএন