পর্তুগালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, কম বেতন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অভিবাসীবিরোধী মনোভাবের কারণে দেশটি ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে এই প্রবণতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সাপ্তাহিক পত্রিকা এক্সপ্রেসো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসী সংগঠন, আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান এবং অভিবাসী সহায়তা নেটওয়ার্কগুলোতে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষের অভিযোগ জমা পড়ছে, যারা পর্তুগালে ভবিষ্যৎ দেখছেন না এবং অন্য দেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বিশেষ করে ব্রাজিলীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে পর্তুগালে বসবাসকারী সবচেয়ে বড় অভিবাসী গোষ্ঠী হলেও এখন তাদের অনেকেই দেশটি ছেড়ে স্পেনসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছেন।
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পর্তুগাল ত্যাগকারী অনেক অভিবাসীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়। যোগ্য ও দক্ষ পেশাজীবীরাও আবাসন চুক্তি নবায়নে অনিশ্চয়তা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সীমিত সুযোগের কারণে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি পেতে জটিলতা এবং পরিবারকে পর্তুগিজ সমাজে একীভূত করার নানা প্রতিবন্ধকতা।
অভিবাসীদের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে পর্তুগালে বসবাস বা কাজের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন বেশি ছিল, এখন সেখানে স্পেনে অভিবাসনের উপায় সম্পর্কে তথ্য খোঁজার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
স্পেন হয়ে উঠছে নতুন গন্তব্য
প্রতিবেশী দেশ স্পেন বর্তমানে পর্তুগাল ছাড়তে ইচ্ছুক অভিবাসীদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ২২১ ইউরো এবং বিভিন্ন খাতে দীর্ঘমেয়াদি চাকরি ও আবাসনের সুযোগ দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও বিলবাওয়ের মতো বড় শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক অভিবাসী স্পেনকে নতুন সম্ভাবনার দেশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
শ্রমবাজারে প্রভাব
এই অভিবাসী বহির্গমনের প্রভাব ইতোমধ্যে পর্তুগালের শ্রমবাজারে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে লিসবন মহানগর এলাকায় যাত্রী পরিবহন সেবা (TVDE) খাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি চালক হারিয়েছে দেশটি।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য TVDE মুভমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শুধুমাত্র লিসবন এলাকায় প্রায় এক হাজার বিদেশি চালক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে হারিয়ে গেছেন। মূল কারণ হিসেবে আবাসিক অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং অভিবাসন সংস্থা AIMA-এর প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করা হচ্ছে।
মানবসম্পদ সংকটে উদ্বেগ
পর্তুগালের সামাজিক সেবা, বৃদ্ধাশ্রম, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতেও কর্মী সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন অব পর্তুগিজ মিজেরিকোরদিয়াস এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের সংগঠন AHRESP কর্মী নিয়োগে বাড়তি সমস্যার কথা জানিয়েছে।
তবে কৃষি খাতে পরিস্থিতি এখনও তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে কনফেডারেশন অব ফার্মার্স অব পর্তুগাল (CAP)। সংগঠনটির মতে, নতুন অভিবাসন নীতিমালা ও সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শ্রমিক সংকট কিছুটা কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসীদের জন্য আবাসন, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সেবায় কার্যকর সংস্কার না আনলে পর্তুগাল ভবিষ্যতে আরও বড় মানবসম্পদ সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। Source: Lusa
